ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ফেব্রুয়ারিতে ট্রায়াল রান, জুলাইয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রো

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
ফেব্রুয়ারিতে ট্রায়াল রান, জুলাইয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রো ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সোহেল রানা সম্প্রতি পূজার ছুটির দিনগুলোতে গ্রামের বাড়ি মোহনগঞ্জ যাওয়ার পথে রাজধানীর ফার্মগেট থেকে ট্রেনে চড়ে মতিঝিল পৌঁছান। সেখান থেকে আরেকটি অটোরিকশায় ৪০ টাকা ব্যয় করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছেন। যেখানে ফার্মগেট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো ভাড়ার পরিমাণ ছিল মাত্র ২৮ টাকা। যাতায়াতে অতিরিক্ত আর্থিক খরচ, যানবাহন বদলানোর ভোগান্তি ও দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়ার মতো নানা বিড়ম্বনা তাকে পোহাতে হয়েছে।

গত বুধবার দুপুরের দিকে এই যাত্রীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ফার্মগেট থেকে দ্রুততম সময়ে মতিঝিল নামা সম্ভব হয়। যদি এই রেল সেবাটি সরাসরি কমলাপুর অব্দি সম্প্রসারিত হতো, তবে যাতায়াত খরচ ও সময় দুটোই অনেক কমে যেত। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু করার কথা রয়েছে এবং জুলাই মাসের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি চালু হতে পারে।

রাজধানীতে এই গণপরিবহনের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে শুধু মতিঝিল স্টেশন ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ যাত্রীর যাতায়াত থেকে। এই পয়েন্ট দিয়ে যাত্রীরা দেশের অন্যতম প্রধান কমলাপুর স্টেশনসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে কমলাপুর পর্যন্ত এই রুট চালু হলে দৈনিক যাত্রী সংখ্যা আরও অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই বর্ধিত অংশের নির্মাণকাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

এই নগর ট্রানজিট নির্মাণ ও পরিচালনা কার্যক্রমের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএল। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে ঘোষণা দিয়েছিল যে জানুয়ারি মাসে পরীক্ষামূলক রান এবং এপ্রিল মাসে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হবে। তবে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এনে এখন নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রায়াল রান সম্পন্ন করে জুলাই মাসের প্রথমার্ধে নিয়মিত যাত্রী নিয়ে রেল চলাচল শুরু হতে পারে।

ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, মতিঝিল ও কমলাপুর মধ্যবর্তী অংশে এখন রেললাইন স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার টানার কাজও এগিয়ে চলেছে। তবে জাপান থেকে স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের মেশিনসহ কিছু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে, যে কারণে চালুর সময় কিছুটা পেছাচ্ছে। এছাড়া কমলাপুর স্টেশনের ভেতর লিফট স্থাপনের মতো কিছু আনুষঙ্গিক কাজও বর্তমানে অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ডিএমটিসিএলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চালুর পর থেকে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত এই রেলপথে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ যাতায়াত করেছেন। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দৈনিক যাত্রী পরিবহন নিয়মিতভাবেই সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়ে যায়। প্রকল্প প্রণয়নের সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে দৈনিক পাঁচ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, যা বর্তমান বাস্তবতার বেশ কাছাকাছি। আর কমলাপুর পর্যন্ত পুরো রুট চালু হলে প্রতিদিন ছয় লাখ ৭৭ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবেন বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকার সামনে অস্থায়ী সিঁড়ি ব্যবহার করে শ্রমিকেরা ওপরে উঠছেন। নির্মাণকর্মীরা জানান, উড়ালসড়ক তৈরির কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং এখন রেলপথ বসানোর কাজ চলছে। সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত এই যানের জন্য দুই পাশে খুঁটি বসানো হয়েছে যার ওপর তার টানা হবে এবং সেই তারের সংযোগের মাধ্যমে ট্রেন এগিয়ে চলে।

কমলাপুর স্টেশনের নিচুতলায় বালু ও পাথরের বড় বড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে কর্মরত শ্রমিক মনির হোসেন জানান, নানা কাজের জন্য নিচের রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে, তাই খুব শীঘ্রই রাস্তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অংশে ট্র্যাক বসানোর কাজ এখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ক্যাবলিংয়ের কাজ হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া লিফট স্থাপন, সিগন্যালিং পদ্ধতি ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া পরিশোধের যন্ত্রপাতি বসানো, টাইলস লাগানো, ওয়াশরুম প্রস্তুত করা এবং পাম্প বসানোর কাজ বাকি রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকৌশলী জানান, ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশনা রয়েছে জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার। তবে কিছু খুচরা কাজ অসমাপ্ত রেਖেই জুলাই মাসে ট্রেন চলাচল শুরু করা সম্ভব, এতে কোনো বড় সমস্যা তৈরি হবে না।

উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই এমআরটি লাইন–৬ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুল ওয়াহাব জানান, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের অবকাঠামোগত কাজের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৫ শতাংশ। আগামী জুনের শেষ নাগাদ অথবা জুলাইয়ের শুরুতে ট্রেন কমলাপুর পর্যন্ত পৌঁছাবে বলে তিনি আশাবাদী। ঠিকাদারের সঙ্গে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও তিন মাস আগেই কাজ শেষ করার লক্ষ্য হাতে নেওয়া হয়েছে।

যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে ২০১২ সালে এই মেট্রো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল, যার মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ শতাংশ অর্থায়ন করেছে জাইকা। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং ২০২৩ সালের নভেম্বরে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত রুট জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

২০২৫ সালের জুন মাসে নির্ধারিত সময়ে মতিঝিল–কমলাপুর অংশ চালুর পরিকল্পনা ছিল। প্রায় এক দশমিক ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বর্ধিত অংশে উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণের জন্য থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালে।

অন্যদিকে ইলেকট্রো–মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে কিছুটা বিলম্ব ঘটে। বিগত সরকারের আমলে প্রাক-প্রস্তাবিত খরচ ছিল ৬৫১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খরচ কমাতে দরকষাকষি করে ১৮৬ কোটি টাকা কমিয়ে ৪৬৫ কোটি টাকায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে এই কাজের দায়িত্ব প্রদান করে, যারা বর্তমানে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক জানান, কমলাপুর স্টেশন দিয়ে এতদিন মূলত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের ট্রেন চলাচল করলেও পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মেট্রো চালু হলে বিপুল পরিমাণ নতুন যাত্রী পাওয়া যাবে এবং শহরের সড়কপথের ওপর থেকে চাপ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বিপুল বিনিয়োগের সঠিক সুফল পেতে হলে যাত্রী চাহিদার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দুই মাস পর নেপাল থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো ৩৮ মেগাওয়াট বিদ

দুই মাস পর নেপাল থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো ৩৮ মেগাওয়াট বিদ