নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ক্রিকেটার গ্যারি কারস্টেনের অপরাজিত ১৮৮ রানের অসাধারণ ইনিংসটি ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। একই টুর্নামেন্টে কেনিয়ার বিপক্ষে পাঁচ উইকেটে ৩৯৮ রান সংগ্রহ করে শ্রীলঙ্কা প্রমাণ করেছিল যে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চার শ রানের বড় সংগ্রহে পৌঁছানো কেবল কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়।
সেই ধারা অব্যাহত রেখে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সময়ের পরিবর্তনে অতি সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এই চার শ রানের মাইলফলকটি আরও একবার সমৃদ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে এ পর্যন্ত মোট পঁয়ত্রিশ বার ওয়ানডে ফরম্যাটে কোনো দলের দলীয় ইনিংস চার শ রান বা তার বেশি ছুঁয়েছে।
এই তালিকায় বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি ভারত সবচেয়ে ওপরে অবস্থান করছে এবং তারা তাদের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ নয়টি ইনিংসে চার শ রান করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ড উভয় দলই আটবার করে চার শ রানের গণ্ডি পার করেছে, আর তিনবার করে এই অর্জনে নাম লিখিয়েছে শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া।
নিউজিল্যান্ড দুইবার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ে একবার করে দলীয় চার শ রানের দেখা পেয়েছে আন্তর্জাতিক আঙিনায়। এই তালিকাটিতে জিম্বাবুয়ের নাম দেখে কিছুটা দীর্ঘশ্বাস বা আক্ষেপের সৃষ্টি হতে পারে, কারণ জিম্বাবুয়ে তো একসময় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবেই বিবেচিত হতো এবং কিছুদিন আগেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দল জিম্বাবুয়ের কাছে পরাজিত হয়েছিল।
এমনকি সেই জিম্বাবুয়ে দলও আজ থেকে তিন বছর আগে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে লড়াই করে চার শ রানের ইনিংস খেলার সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, বর্তমানে টেস্ট খেলার মর্যাদাপ্রাপ্ত ১২টি দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এখনো দলীয় চার শ রানের দেখা পায়নি কেবল পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ফরম্যাটে চার তো দূরের কথা, এখনো পর্যন্ত সাড়ে তিন শ রানের কোটাও স্পর্শ করতে পারেনি। ২০২৩ সালে সিলেটের মাঠে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় উইকেটে সংগৃহীত ৩৪৯ রানই বর্তমানে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে আছে।
এর মানে হলো আন্তর্জাতিক একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চার শ রানের বিশাল দুনিয়ায় বাংলাদেশ জাতীয় দল এখনো পর্যন্ত নিজেদের কোনো স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ দলের এই অভাব থাকলেও দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের আঙিনায় ইতোমধ্যে চার শ রানের ইনিংস সফলভাবে বাস্তবায়িত হতে দেখা গেছে।
চলতি বছরের জুন মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে আবাহনী লিমিটেডের বিপক্ষে চার উইকেটে ৪০৬ রানের পাহাড়সম সংগ্রহ গড়েছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ যেহেতু একটি সরকারিভাবে স্বীকৃত লিস্ট এ মর্যাদার আসর, তাই অত্যন্ত নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে এই সংস্করণে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট দল অন্তত চার শ রানের স্বাদ পেয়েছে।
অবশ্য এর আগেও দেশের মাটিতে ঘরোয়া পর্যায়ে আরেকটি ম্যাচে চার শ রান দেখার সুযোগ হয়েছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের, যা ছিল একটি প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সেই প্রস্তুতি ম্যাচে টাইগার্স দলের বিপক্ষে পাঁচ উইকেটে ৪০৩ রানের বিশাল স্কোর গড়েছিল এইচপি দল।
বাংলাদেশ জাতীয় দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চার শ রান করতে না পারলেও বর্তমান ক্রিকেট বিশ্ব যেন পুরোপুরিভাবে চার শ রান গড়ার এবং সেই বিশাল রান সফলভাবে তাড়া করে ম্যাচ জেতার এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এবং বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ঘরোয়া টুর্নামেন্টের রমরমা বাণিজ্যিক সূচনার পর থেকেই এই রান উৎসবের প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে যে এই প্রবণতাটি আরও বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া সময়ের মধ্যে। বিশ্ব ক্রিকেটের লিস্ট এ স্বীকৃত ক্রিকেটের ইতিহাসে চার শ বা তার বেশি রান সফলভাবে তাড়া করে ম্যাচ জয়ের মোট পাঁচটি অবিশ্বাস্য ঘটনা এ পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে অবাক করার মতো বিষয় হলো এই যে, লিস্ট এ ক্রিকেটের ইতিহাসের এই পাঁচটি সফল রান তাড়াযুদ্ধের মধ্যে মোট চারটি ঘটনাই সংঘটিত হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। প্রথম চার শ রান সফলভাবে তাড়া করে ম্যাচ জেতার সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিশ্চয়ই ক্রিকেটপ্রেমী মাত্রেরই স্মৃতিতে তরতাজা রয়েছে।
২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত সেই স্মরণীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার গড়া ৪৩৪ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য সফলভাবে টপকে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা দল। ওয়ানডে ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এটিই এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান তাড়া করে ম্যাচ জয়ের অবিস্মরণীয় রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে।
রাওয়ালপিন্ডির মাটিতে শ্রীলঙ্কা দল গতকাল ইংল্যান্ডের দেওয়া ৪২৯ রানের বিশাল লক্ষ্য সফলভাবে তাড়া করে জয় তুলে নেওয়ার সুবাদে এই রেকর্ড তালিকার দ্বিতীয় স্থানটি নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। আর এই তালিকার তৃতীয় স্থানটিও অত্যন্ত গৌরবভরে দখল করে আছে শ্রীলঙ্কা দল নিজেই।
২০০৯ সালে ভারতের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচে ভারতের দেওয়া ৪১১ রানের লক্ষ্য সফলভাবে তাড়া করে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছিল শ্রীলঙ্কানরা। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেট যেহেতু লিস্ট এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত একটি বিশেষ সংস্করণ, তাই বাকি দুটি রান তাড়ায় জয়ের ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণভাবে ঘরোয়া লিস্ট এ ক্রিকেটের মঞ্চে।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী বিজয় হাজারে ট্রফিতে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ঝাড়খন্ডের দেওয়া ৪১২ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য অনায়াসেই তাড়া করে জিতেছিল কর্ণাটক দল। অন্যদিকে গত জুলাই মাসে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আয়োজিত ইন্টার-প্রভিন্সিয়াল লিমিটেড ওভার কাপ টুর্নামেন্টে নর্দান নাইটসের করা ৪১৪ রানের বিশাল সংগ্রহ টপকে জয় পেয়েছিল লেনেস্টের লাইটনিং।
অর্থাৎ বিগত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে এ পর্যন্ত লিস্ট এ ক্রিকেটের ইতিহাসে চার শ রান তাড়া করে জয়ের যে চারটি রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে দুটি সংঘটিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে এবং বাকি দুটি ঘটেছে দেশের ঘরোয়া লিস্ট এ ক্রিকেটের পরিমণ্ডলে।
তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, লিস্ট এ ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে কি কখনো পাঁচ শ রানের বিস্ময়কর ইনিংসের দেখা মিলেছে? এর উত্তরে অত্যন্ত নিশ্চিতভাবেই হ্যাঁ বলতে হবে, আর এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাই ঘটেছে ভারতের জনপ্রিয় বিজয় হাজারে ট্রফির মঞ্চে।
২০২২ সালে বেঙ্গালুরু শহরে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচে অরুণাচল প্রদেশের বিপক্ষে মাত্র দুটি উইকেট হারিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ৫০৬ রানের পাহাড়সম সংগ্রহ গড়েছিল তামিলনাড়ু দল। এর ঠিক এক বছর পর গত ডিসেম্বরের মাসে সেই একই অরুণাচল প্রদেশের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষেই ছয় উইকেটে ৫৭৪ রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল বিহার দল। আর আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ফরম্যাটে কোনো দলের ইনিংস হিসেবে সর্বোচ্চ ৪৯৮ রানের অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ডটি বর্তমানে ইংল্যান্ড দলের দখলে রয়েছে, যা তারা ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে স্থাপন করেছিল।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর