ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী পলো বাইচ উৎসব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী পলো বাইচ উৎসব ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

অক্টোবর মাসজুড়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন নদনদী ও জলাশয়গুলোতে ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সপ্তাহের শেষ দুটি কার্যদিবস অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পলোয়ালদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। এই আনন্দ আয়োজনের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে স্থানীয় হাটবাজারে ঢোল বাজানো এবং মাইকে প্রচার চালানো হয়ে থাকে। ঘোষণা শোনার পর প্রথাগত পলো হাতে নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হন দূরদূরান্ত থেকে আসা শৌখিন মৎস্যশিকারিরা। জলাশয়ে নেমে মাছ শিকারের উত্তেজনার পাশাপাশি পরিচিতজন ও স্বজনদের সঙ্গে একত্রিত হওয়া এবং আবহমান কাল ধরে চলা সংস্কৃতির অংশ হতে পেরে সবাই দারুণ আনন্দ পান।

মাছ ধরতে আসা ইসলাম খান নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন যে, পলো দিয়ে মাছ শিকারের মজাই সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে বড় বা ছোট মাছ পাওয়ার পাশাপাশি প্রিয়জনদের দেখা পাওয়ার সুযোগ মেলে এবং সকলে মিলে আনন্দ উপভোগ করা যায়। এই প্রাচীন ঐতিহ্য যাতে কোনো দিন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আরেক উৎসাহী শিকারি মাহফুজ ভূঁইয়া জানান, জালে মাছের পরিমাণ কম মিললেও পলো কাঁধে নিয়ে জলাশয়ে অবতীর্ণ হওয়ার উন্মাদনা जराও কমে যায় না। কার জালে বড় আকৃতির মাছ ধরা পড়ল, তা নিয়ে সবার মাঝে এক ধরনের আনন্দঘন প্রতিযোগিতা চলে। প্রতিবছর এমন উৎসবমুখর পরিবেশের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন।

ঘিওর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা বারেক মিয়া অতীতের স্মৃতির রোমন্থন করে বলেন, অতীতে এখানকার প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো দেশি মাছে পরিপূর্ণ থাকত। পলো হাতে পানিতে নামলে অনেকেই বড় আকৃতির মাছ পেতেন এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দলবেধে মানুষ আসত। বর্তমানে অনেক স্থানে মাছের পরিমাণ হ্রাস পেলেও মানুষ তাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে।

ঘিওরের প্রাকৃতিক কৃষিকেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান মন্তব্য করেছেন যে, পলো বাইচ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। এই আয়োজন বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাশয় ও দেশি মাছের বংশ রক্ষা করতে দেশের সব নাগরিককে সচেতন হতে হবে।

অতীতে কার্তিক থেকে শুরু করে মাঘ মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে নদী, খাল ও জলাশয়ের পানি কমে গেলে পলো দিয়ে মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। মানিকগঞ্জ অঞ্চলের ইছামতী, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, গাজীখালী ও কান্তাবতী নদীর পানির ধারায় এমন উৎসব নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানেও সেই চর্চার অস্তিত্ব রয়েছে, তবে তা অতীতের তুলনায় বেশ সীমিত আকারে হয়ে থাকে।

বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস আর আনসারী বিলটু মনে করেন, পলো দিয়ে মাছ শিকার কেবল জীবিকা বা শখ নয়, এটি সাধারণ মানুষের মিলনমেলা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত লোকজ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। প্রাকৃতিক জলাশয় এবং দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেই কেবল এই অমূল্য ঐতিহ্য টিকে থাকবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ অঞ্চলের সমন্বয়কারী বিমল রায় উল্লেখ করেন যে, পলো বাইচের গৌরবময় ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে জলাশয় ও দেশি মাছের প্রজননক্ষেত্রগুলো রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, অপরিপক্ব পোনা শিকার, সেচ দিয়ে জলাশয়ের পানি কমানো এবং বিষ প্রয়োগের ফলে দেশি মাছের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

বড়টিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামছুল আলম রওশন বলেন, বহু যুগ ধরে চলে আসা পলো বাইচ উৎসবকে কেন্দ্র করে আশপাশের জনপদের মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। তবে ক্ষতিকর কারেন্ট জালের যত্রতত্র ব্যবহার, পোনা মাছ নিধন, জলাশয় শুকিয়ে ফেলা এবং বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের প্রজাতি ও সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এই প্রাচীন ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের আন্তরিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মাদক দেখার জেরে যুবদল নেতার পরিবারকে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির

মাদক দেখার জেরে যুবদল নেতার পরিবারকে নির্যাতন ও চাঁদা দাবির