নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জনগণের মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই মূলত সমস্ত দাবি উত্থাপন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন যে ঘোষিত সাত দফা মেনে নেওয়া হলে নতুন কোনো এক দফা আন্দোলনের প্রয়োজন পড়বে না। তবে যদি এই যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে বাধ্য হয়েই দেশ ও জনগণের স্বার্থে এক দফার কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
গত শনিবার দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া শহরের শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম মাঠে আয়োজিত এক মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ১১-দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এই লংমার্চের সমাপনী দিনে তিনি শীর্ষ নেতাদের বহর নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে মঞ্চে উপস্থিত হন এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে জনগণের সরাসরি ভোটে গঠিত সংসদের পাশাপাশি একটি সংস্কার পরিষদ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল। সেই পরিষদ আইনসভায় বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কৌশলে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন কুক্ষিগত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর ফলে বর্তমান কতৃপক্ষ নিজেদের সর্বেসর্বা মনে করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সতর্ক করেন যে অতীতে যখনই সাধারণ মানুষের মতামতের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট শক্তিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চের শেষ গন্তব্য কুষ্টিয়ায় এসে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন যে প্রয়োজনে বিপরীতমুখী যাত্রায় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুত কি না।
এই সংগ্রামে কোনো অর্থ বা উন্নত খাবারের আয়োজন নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে তিনি বলেন যে জনগণের অধিকার রক্ষার এই লড়াইয়ে যদি জীবন বিসর্জন দিতে হয়, তবুও অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। উপস্থিত জনতাকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কুষ্টিয়া জেলা শাখার আমির খন্দকার এ কে এম আলী মুহসিন এবং সেক্রেটারি এনামুল হকের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে মাত্র আট মাসের মাথায় মাঠে নামার কোনো ইচ্ছা তাদের ছিল না।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন যে জনগণের সঙ্গে করা ওয়াদা রক্ষা না করে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে দুর্নীতি ও লুটপাট চলছে। সচিবালয় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূলে সারের ডিলারশিপ পেতেও বড় অংকের উৎকোচ নেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তোলেন তিনি।
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে এই দেশকে কখনোই অন্য কোনো রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না মিললে বর্তমানের সাত দফা যেকোনো মুহূর্তে এক দফায় রূপান্তরিত হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
জনগণের অধিকার আদায় না করে কেউ ঘরে ফিরবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন যে এই ভূখণ্ডে আর কারও পৈতৃক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে দেওয়া হবে না। এক দফার ডাক আসলে ঢাকার দিকে যাত্রা করার জন্য তিনি উপস্থিত জনতার সমর্থন কামনা করেন এবং সবাই হাত উঁচিয়ে সম্মতি জানান।
অনুষ্ঠানে অন্য বক্তাদের মধ্যে কর্নেল অলি আহমদ বলেন যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত এবং সুশাসনে ভরপুর একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের কার্যক্রমের সঙ্গে অতীতের শাসনব্যবস্থার কোনো তফাত পাওয়া যাচ্ছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সবস্তরে চলমান দলীয়করণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাধারণ মানুষকে আরও কষ্ট সহ্য করার আহ্বান জানিয়ে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা সবসময় জনগণের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এই সমাবেশে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল হান্নান মাসউদসহ ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন শরিক দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা এবং সংসদ সদস্যরাও মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার প্রাক্কালে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট থেকে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক ধরে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করেছিল। হানিফ ফ্লাইওভার পেরিয়ে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে গভীর রাতে কুষ্টিয়ায় এসে পৌঁছায়।
প্রায় চারশো পঁচিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় মোট উনিশটি জেলা অতিক্রম করেছে লংমার্চের বহর। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থানে একাধিক পথসভার আয়োজন করা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
এর আগে গত পাঁচ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম এবং উনিশ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি সফল করেছিল এই ১১-দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের সফল সমাপ্তির পর আগামী একুশ নভেম্বর সিলেট অঞ্চলের দিকে লংমার্চ পরিচালনা করার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর