নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে হওয়া কথোপকথন নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও সেই আলাপটি ঠিক কোন তারিখের, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই কথোপকথনটি চলমান জাতীয় ক্রিকেট লিগ বা এনসিএলের সময়কার।
জাতীয় নির্বাচক প্যানেলের একজন সদস্য আরও নির্দিষ্ট করে দাবি করেছেন যে, এই ঘটনাটি ঘটেছে প্রতিযোগিতার তৃতীয় রাউন্ডের ঠিক আগে। মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজের পূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবেই কয়েকজন টেস্ট ক্রিকেটারের এই রাউন্ডে মাঠে নেমে খেলার কথা নির্ধারিত ছিল।
দলীয় টিম ম্যানেজমেন্টের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও পরিকল্পনা অনুযায়ীই জাতীয় লিগের উইকেটগুলো স্পিন-সহায়ক করে তোলার বিষয়টি সামনে এসেছিল। এই পুরো বিষয়টি নিয়ে যখন প্রধান কিউরেটর টনি হেমিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তখন তিনি কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করতে স্পষ্টভাবে রাজি হননি।
তবে যোগাযোগ করার পর তিনি উল্লিখিত আলাপচারিতাটি যে জাতীয় লিগের উইকেট সংক্রান্ত, সেই সত্যতা অস্বীকার করেননি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন যে, এই নির্দিষ্ট আলাপচারিতাটি মূলত কোনোভাবেই টেস্ট ক্রিকেট-সম্পর্কিত ছিল না।
এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি কিছু অভিনব পরিবর্তন ও নতুনত্ব আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এর অংশ হিসেবেই দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা তাদের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো মর্যাদাপূর্ণ ব্যাগি টুপি ও আকর্ষণীয় ব্লেজার লাভ করেছেন।
কিন্তু মাঠের বাস্তব খেলায় এর মাধ্যমে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? বর্তমান চলতি জাতীয় লিগের সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আগের মতোই রয়েছে এবং যথারীতি স্পিনারদের একচ্ছত্র দাপট বজায় রয়েছে।
স্পিনারদের এই লাগাতার দাপট প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিসিবির ওই নির্বাচক নিজের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় গণমাধ্যমকে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এবারের টুর্নামেন্টে খেলার বল পরিবর্তন করা হয়েছে, যার কারণে ফাস্ট বোলাররা এখন সেভাবে কোনো সহায়তা পাচ্ছে না।
বল পরিবর্তনের ফলে পেসাররা সুবিধা করতে না পারায় স্পিনাররা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি ওভার বল করছে। তবে স্পিনারদের বেশি সফল হওয়ার অর্থ এই নয় যে উইকেটের চরিত্র জেনেশুনে স্পিন-সহায়ক করে তৈরি করা হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগের তিনটি মৌসুমে ঘরোয়া লিগে ডিউক বল ব্যবহার করে ম্যাচগুলো খেলা হয়েছিল। সেই সময়ে পেস বোলাররা অনেক বেশি বল করার সুযোগ পেত এবং পেসার ও স্পিনারের অনুপাত ছিল মূলত সত্তর ও ত্রিশ শতাংশ।
সেই সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বোলিং করতেন পেস বোলাররা এবং মাত্র ৩০ শতাংশ বল করতেন স্পিনাররা। কিন্তু বর্তমানে বল বদলানোর পর সেই চিত্র ঠিক উল্টো হয়ে গেছে, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ বোলিংই এখন স্পিনারদের কাঁধে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল নিয়মিতভাবে খাবি খাওয়ার কারণে বিগত কয়েক বছর ধরে বিসিবি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উইকেটের চরিত্র ও ম্যাচ বল পরিবর্তনের জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
এর সুবাদে নাহিদ রানা কিংবা হাসান মাহমুদের মতো উদীয়মান তরুণ পেসারদের আন্তর্জাতিক মানে তৈরি হওয়ার উপযুক্ত সুযোগ মিলছিল। এমনকি চলতি বছরের গত মে মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ দল স্পোর্টিং উইকেটে খেলার সাহস দেখিয়েছিল।
সেবার তারা শুধু স্পোর্টিং উইকেটে খেলার সাহসই দেখায়নি, বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে ধবলধোলাই করে দুর্দান্ত সাফল্য অর্জন করেছিল।
কিন্তু ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই যদি যথার্থ টেস্ট-সংস্কৃতির সঠিক চর্চা বজায় না থাকে এবং নিয়মিতভাবে স্পোর্টিং উইকেটে খেলার সুযোগ তৈরি না হয়, তবে সমস্যা তৈরি হয়।
পাশাপাশি শতভাগ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে যদি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা মাঠে না গড়ায়, তবে বহু আগে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের দেখানো পুরনো ফর্মুলায় কৃত্রিম ঘূর্ণি উইকেট বানিয়েও কোনো লাভ হয় না।
এর সত্যতা সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজেও আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে ঘূর্ণি পিচেও কাঙ্ক্ষিত ভালো ফল পাওয়া যায়নি।
হাতের তালুর মতো সম্পূর্ণ চেনা মিরপুরের চেনা উইকেটে উইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচে প্রতিপক্ষের যে মোট ১২টি উইকেট পড়েছিল, তার মধ্যে স্বাগতিক বাংলাদেশের তিন স্পিনারের অবদান ছিল মাত্র ৮ উইকেট।
অন্যদিকে ক্যারিবীয় স্পিনাররা ঠিকই স্বাগতিক ব্যাটারদের ইনিংসে চেপে বসে বাংলাদেশের ২০টি উইকেটের মধ্যে একাই ১৬টি তুলে নিয়েছিলেন।
ওয়ারিক্যানরা যেখানে উইকেটে গড়ে প্রায় ৩.৫ ডিগ্রিতে বল টার্ন আদায় করে নিয়েছিলেন, সেখানে মেহেদী হাসান মিরাজরা সেটি ২.৫ ডিগ্রির বেশি নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকেই যেভাবে অন্ধভাবে স্পিন-নির্ভরতার ভুল চর্চা চালিয়ে যাওয়া হয়, টেস্ট ক্রিকেটে এসেই সেই একই কারণে আবার আটকে পড়ে বাংলাদেশ দলের চরম হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর