ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নতজানু পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল: জহরত আদিব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
নতজানু পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল: জহরত আদিব ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার পরিবর্তে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশাসনের নতজানু বৈদেশিক নীতি বাংলাদেশকে বেশ খানিকটা পেছনে ফেলে দিয়েছিল বলে দাবি করেছেন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রধান এবং সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’ শিরোনামের চতুর্থ দফার আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর নবগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল, তাদের সবার সঙ্গে পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সোনালী সুযোগ আমাদের সামনে এসেছিল, কিন্তু আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সুযোগটি হাতছাড়া করে ফেলি।

সঠিক ও সময়োপযোগী বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই সে সময় বিদেশ থেকে আসা অনেক সাহায্য-সহযোগিতা চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।

একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ওই নেতিবাচক প্রভাব কোনোভাবেই এড়াতে না পারার কারণে পরবর্তীতে দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষসহ নানা জটিল ও মারাত্মক সমস্যা আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল বলে তিনি জানান।

‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ নামের এই বিশেষ সেমিনারটি সঞ্চালনা করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক তুহিন খান।

উক্ত আয়োজনে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, গবেষকদল, আইনজীবী সমাজ, সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়াও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

জহরত আদিব চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় আরও যোগ করেন যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের দশকের দ্বিতীয় পর্যায়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন।

তিনি সর্বদা জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়ে ঠিক যেখানে দেশের স্বার্থ জড়িত রয়েছে, ঠিক সেখানেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোকে আরও বেশি জোরদার করার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের জন্য পাঠানোর সোনালী দুয়ার তিনিই প্রথম উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বলে সংসদ সদস্য উল্লেখ করেন।

এর বিপরীত চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দেশের ভেতর গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল, যা সমগ্র বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছিল।

উক্ত আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক মো তাঁর বক্তব্যে জানান যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত তাদের নিজস্ব কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই মূলত বাংলাদেশকে সহযোগিতা প্রদান করেছিল।

তবে জুলাইয়ের ৫ তারিখের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পূর্বে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এমন একধরনের রাজনৈতিক প্রচার চালাত, যা শুনলে মনে হতো যেন ভারত সরকার নিজ থেকেই আমাদের একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে।

শিক্ষক আবদুল মান্নান আরও বলেন যে, এ ধরনের অগ্রহণযোগ্য ও অবমূল্যায়নমূলক প্রচারণার মাধ্যমে দেশীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিয়ত অসম্মান করা হতো এবং ভারত সবসময় তাদের নিজস্ব স্বার্থে বাংলাদেশকে সবসময় একটি নতজানু রাষ্ট্র হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করেছে।

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরপরই পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে এই মর্মে প্রচারণা চালাত যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়ার মূল বিষয়টি হলো মূলত একটি শক্তিশালী মুসলিম দেশকে কৌশলে দুই টুকরো করে বিভক্ত করা।

এই বহুমুখী ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী বৈদেশিক নীতি দাঁড় করানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ ছিল বলে তিনি মনে করেন।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান নতজানু বৈদেশিক নীতির ধারা বেছে নিয়ে সেই পথটিকে আরও দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছিলেন বলে আলোচক মন্তব্য করেন।

সভার সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের বৈদেশিক নীতির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন করতে গেলে মূলত প্রধান দুটি নামই সামনে চলে আসে, আর তারা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

শেখ মুজিবের শাসনামলের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, সে সময়কার প্রবীণ নাগরিকেরা আক্ষেপ করে প্রায়শই বলতেন, ‘পাকিস্তানকে কি তবে বিদায় করেছি ভারতীয় গোলামি করার জন্য?’

অর্থাৎ দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় পাওয়ার পর যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন শেখ মুজিবের নতজানু বৈদেশিক নীতির কারণে তরুণ বয়সটা লড়াইয়ে কাটিয়ে দেওয়া সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল।

তারা মনে করতে শুরু করেছিলেন যে, দেশ দীর্ঘদিনের সেই পাকিস্তানি বেড়াজাল থেকে কোনোমতে মুক্ত হয়ে সরাসরি আবার ভারতের নিয়ন্ত্রণ বা হাতের মুঠোয় চলে গেছে এবং এই বিষয়টি তারা কোনোভাবেই সহজে মেনে নিতে পারেননি।

এহ্সান মাহমুদ তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় আরও যোগ করেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘হিজবুল বাহার’ নামক একটি বিশেষ জাহাজে করে দেশের সম্ভাবনাময়ী মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময়ে দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা ঘুরে ঘুরে দেখাতে নিয়ে যেতেন।

একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিজে উপস্থিত থেকে দেশের তরুণ সমাজকে সমুদ্রসীমা পরিভর্শন করাতেন এবং তাদের বোঝাতেন যে এটি আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণের কারিগররা যেন স্বয়ং নিজে হাতে এই দেশপ্রেমের শিক্ষাটা সঠিকভাবে লাভ করতে পারে, সেই সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা তিনি করে গিয়েছিলেন।

তিনি বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি আগামী দিনের বাংলাদেশের নাগরিকেরা যেন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে নিজ দেশকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে উন্নীত করতে পারেন, সেই দূরদর্শী শিক্ষাও তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সংঘর্ষের মামলায় ২৬ জন কারাগারে

মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সংঘর্ষের মামলায় ২৬ জন কারাগারে