ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ভুলে অজু ছাড়া নামাজ পড়লে করণীয় কী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
ভুলে অজু ছাড়া নামাজ পড়লে করণীয় কী ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

নামাজ আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা বা অজু করা সর্বাগ্রে আবশ্যক একটি শর্ত। ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পবিত্রতা অর্জনের এই প্রক্রিয়াটিকে সালাতের মূল চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বর্তমান সময়ের দ্রুতগতির যান্ত্রিক জীবনে নানা ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় মানুষ কোনো প্রকার সচেতনতা ছাড়াই সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে অজু না করেই সরাসরি সালাতে দাঁড়িয়ে যান। আবার কখনো কখনো নিজের অজু অক্ষুণ্ণ আছে কি না কিংবা তা আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে তীব্র মানসিক সন্দেহের চোরাবালিতে আটকে পড়েন।

ইবাদত-বন্দেগির এই পবিত্র মুহূর্তগুলোতে মানুষের মনে নানা ধরনের সংশয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করার কাজে কুপ্রবৃত্তির প্রতীক শয়তান অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। ফিকহ শাস্ত্র এই ধরনের জটিল ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে খুবই স্পষ্ট, যৌক্তিক এবং সহজবোধ্য সমাধান বাতলে দিয়েছে।

কোনো ব্যক্তি যদি জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে পবিত্রতা অর্জন ছাড়াই সালাত আদায় করে, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত অবাধ্যতা এবং অনেক ইসলামী আইনবিদের মতে তা কুফরির খুব কাছাকাছি একটি গুরুতর পাপ হিসেবে গণ্য হয়। তবে যদি কেউ কোনো রকম পূর্বসচেতনতা ছাড়াই সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুলে গিয়ে অজু না করেই সালাত সম্পন্ন করে এবং সালাত শেষ করার পর তার বিষয়টি স্মরণে আসে, তবে এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে তাকে কোনো পাপের মুখোমুখি হতে হবে না।

কিন্তু শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তার সম্পাদিত ওই সালাতটি সম্পূর্ণ বাতিল এবং অকার্যকর বলে গণ্য হবে। এই বিষয়ে নবীজি (সা.) অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন যে, পবিত্রতা ছাড়া অর্থাৎ যথাযথভাবে অজু বা গোসল ব্যতিরেকে কোনো সালাতই আল্লাহর দরবারে কবুল করা হয় না। এই প্রামাণ্য হাদিসটি ইমাম মুসলিম তাঁর সংকলনে ২২৪ নম্বর হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কোনো বান্দা যদি ভুলবশত অজু ছাড়াই কিংবা নাপাক পোশাকে সালাত শেষ করে ফেলে এবং পরবর্তীতে তা বুঝতে পারে, তবে তার ওপর অনিবার্য দায়িত্ব হলো পুনরায় নতুন করে পবিত্রতা অর্জনপূর্বক ওই সালাতটি আবার আদায় করা। ভুলের কারণে সে আল্লাহর কাছে অপরাধী না হলেও তার পূর্বের সালাতটি পুরোপুরি বাতিল বলে ধর্তব্য হবে। এই বিষয়টি আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের উনআংশীতম পৃষ্ঠায় দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত থেকে ২০০০ সালে প্রকাশিত সংস্করণে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

অনেক সময় সালাত চলমান থাকা অবস্থায় মুসল্লির মনে হঠাৎ এই মর্মে সন্দেহ জাগতে পারে যে তার শরীর থেকে বোধ হয় বায়ু নির্গত হয়েছে কিংবা তার অজু ভেঙে গেছে। এটি মূলত বান্দার ইবাদত নষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্যে শয়তানের একটি অতীব সূক্ষ্ম প্ররোচনা বা চক্রান্ত বৈ আর কিছু নয়। এই ধরনের অমূলক সংশয় বা সন্দেহ তৈরি হলে কোনো অবস্থাতেই চলমান সালাত ভেঙে ফেলা যাবে না।

সালাতের ভেতরে এই জাতীয় অজু ভঙ্গের সন্দেহ হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একবার এক ব্যক্তি মহানবীর দরবারে এসে অভিযোগ পেশ করলেন যে, সালাত আদایরত অবস্থায় তাঁর মনে হচ্ছে যেন অজু ভেঙে গেছে। তখন প্রিয়নবী (সা.) তাঁকে একটি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি শিক্ষা দিয়ে নির্দেশ দিলেন যে, ওই ব্যক্তি যেন সালাত কোনোভাবেই বন্ধ না করে, যতক্ষণ না সে স্বয়ং বায়ু নির্গত হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট শব্দ কানে শোনে অথবা তার কোনো গন্ধ না পায়। এই হাদিসটি সহিহ বুখারির ১৩৭ নম্বর হাদিস হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

অর্থাৎ, বিষয়টিতে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র মনের ভেতর উদিত সন্দেহের বশবর্তী হয়ে চলমান সালাত কোনোক্রমেই ত্যাগ করা যাবে না।

সালাতে দাঁড়ানোর ঠিক পূর্বক্ষণে যদি কারও মনে এমন সংশয় দেখা দেয় যে তার অজু আছে কি না, তবে এই ধরনের পরিস্থিতিতে ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি মৌলিক সোনり নীতি হলো এই যে, নিশ্চিতভাবে জানা কোনো বিশ্বাস কেবল সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে দূর হয়ে যায় না।

অতএব, যদি কোনো ব্যক্তির দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে তিনি অজু করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে অজু ভেঙে যাওয়ার ব্যাপারে নিছক কিছু সন্দেহ দানা বাঁধে, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি পূর্বের অজু অবস্থাতেই বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। তিনি ওই সন্দেহজনক অবস্থাতেই সালাত আদায় চালিয়ে যেতে পারবেন। ভিত্তিহীন সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বারবার অকারণে অজু করা শয়তানের প্ররোচনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বিধানটি ইবনে আবিদিনের রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১৪৮ পৃষ্ঠায় ১৯৯২ সালে বৈরুতের দারুল ফিকর থেকে প্রকাশিত সংস্করণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতিতে, যদি কারও সুনির্দিষ্টভাবে মনে থাকে যে তার অজু একসময় ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নতুন করে অজু সম্পন্ন করেছেন কি না তা নিয়ে মনে সন্দেহ জাগে, তবে তাকে অবশ্যই নতুন করে অজু করে নিতে হবে।

সালাত আদায়কালে যদি বাস্তবিকপক্ষেই কারও অজু ভেঙে যায়, যেমন—শরীরের ভেতর থেকে বায়ু নির্গত হওয়া অথবা রক্ত বা এজাতীয় কিছু বের হওয়া, তবে সামান্যতম লজ্জাবোধ না করে তাৎক্ষণিকভাবে সালাত থেকে বের হয়ে যাওয়া আবশ্যক। লজ্জার খাতিরে অজু ছাড়াই সালাত চালিয়ে যাওয়া একটি গর্হিত কাজ।

অজু করার সময় যদি হঠাৎ মনে এই সন্দেহ জাগে যে মুখমণ্ডল বা হাত সঠিকভাবে ধোয়া হয়েছে কি না, তবে এর বিধান হলো—কারও জীবনে যদি এই ধরনের সন্দেহ কদাচিৎ বা মাঝেমধ্যে হয়ে থাকে, তবে যে অঙ্গটি ধোয়া নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে, তা পুনরায় ধুয়ে নেওয়া তার জন্য শ্রেয় ও উত্তম।

পক্ষান্তরে কেউ যদি অতিরিক্ত শুচিবায়ু বা মানসিক ওয়াসওয়াসার রোগে ভুগে থাকেন এবং প্রায় নিয়মিতই তার মধ্যে এই ধরনের সন্দেহ কাজ করে, তবে তিনি তার এই সন্দেহকে কোনো পাত্তাই না দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে অজু সম্পন্ন করে যাবেন। কারণ, এই ধরনের অবান্তর সন্দেহকে প্রশ্রয় দিলে তা একসময় মারাত্মক মানসিক ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে।

নিছক সন্দেহ নয়, বরং সালাত চলমান থাকা অবস্থায় যদি সত্যি সত্যি কারও অজু ভেঙে যায়, তবে বিন্দুমাত্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা লজ্জা না রেখে সাথে সাথে সালাত ত্যাগ করা শরিয়তে জরুরি করা হয়েছে। লজ্জার বশবর্তী হয়ে অজুবিহীন অবস্থায় সালাত চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।

এমন বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে পুনরায় নতুন করে অজু সম্পন্ন করে এসে স্থগিত সালাত পূর্ণ করতে হবে।

ইসলাম মূলত একটি সহজ ও বাস্তবমুখী পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পবিত্রতা ও অজু অর্জনের ক্ষেত্রে অহেতুক সন্দেহপ্রবণতা কিংবা শুচিবায়ু পুরোপুরি পরিহার করে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করাই হলো নবীজির শেখানো শাশ্বত ও প্রকৃত সুন্নত।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
বিজয়ের মন জয় করতে পুরো এক বছর চেষ্টা করেছিলেন রাশমিকা

বিজয়ের মন জয় করতে পুরো এক বছর চেষ্টা করেছিলেন রাশমিকা