নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিমানের কেবিন ক্রু হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে থাইল্যান্ডের রানি সুথিদা রাজকীয় অবস্থান ছাড়িয়ে ফাইটার পাইলট হিসেবে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল আকাশে ওড়ার মাধ্যমে, যেখানে তিনি সাধারণ কর্মী থেকে ধাপে ধাপে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজপরিবারের আসনে আসীন হন।
পেশাগত জীবনের প্রথমভাগে তিনি সুদীর্ঘ সময় ধরে আকাশপথে যাত্রী সেবামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষা সমাপ্তির পরপরই তিনি ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাপান এয়ারলাইনসে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত থাই এয়ারওয়েজে কেবিন ক্রু পদে কর্মরত থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই কর্মজীবন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে রাজপরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিমণ্ডলে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।
সুথিদার জীবনের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে ২০১০ সালে, যখন তিনি থাইল্যান্ডের তৎকালীন রাজার রয়্যাল সিকিউরিটি কমান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। এই বিশেষ যোগদানের মাধ্যমেই তাঁর রাজকীয় জীবন এবং একই সঙ্গে কঠোর অ্যাভিয়েশন প্রশিক্ষণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
সামরিক বাহিনীতে তাঁর পদোন্নতিও ছিল বেশ দ্রুত ও চমকপ্রদ। সুদীর্ঘ কর্মতৎপরতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তিনি দেশটির সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে নিজের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দেন।
এর তিন বছর পর ২০১৯ সালের ১ মে তিনি রাজা মহা বাজির্যালংকর্নের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিয়ের মাধ্যমেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে থাইল্যান্ডের রানি হিসেবে রাজকীয় মর্যাদা ও সম্মান লাভ করেন।
তাঁর পাইলট জীবনের শুভসূচনা হয়েছিল ২০১০ সালে সামরিক প্রশিক্ষণ বিমান সেসনা টি-৪১ডি পরিচালনার মাধ্যমে। এই বিমান চালনার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন যেন এক রোমাঞ্চকর গল্পের রূপকথায় পরিণত হতে শুরু করে।
এরপর তিনি থাইল্যান্ড ও জার্মানিতে অবস্থান করে বাণিজ্যিক এবং সামরিক বিমান চালানোর জন্য অত্যন্ত কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ ও কঠিন প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করে তিনি নিজেকে একজন দক্ষ বৈমানিক হিসেবে গড়ে তোলেন।
প্রশিক্ষণ শেষে তিনি একে একে বাণিজ্যিক পাইলটের যোগ্যতা, বোয়িং ৭৩৭ টাইপ রেটিং এবং এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স অর্জন করেন। এসব সনদ অর্জনের পর তিনি দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন বড় বিমান চালাতে সক্ষম হন।
তিনি তাঁর স্বামী রাজা মহা বাজির্যালংকর্নের সঙ্গেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় সফরে সহ-পাইলট হিসেবে আসন গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁরা একত্রে বোয়িং ৭৩৭ বিমান পরিচালনা করে আকাশপথে যাতায়াত করেন।
চলতি বছরের আগস্ট মাসে রানি সুথিদা সুরাত থানি প্রদেশের উইং ৭ এয়ার বেসে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি জেএএস ৩৯ গ্রিপেন যুদ্ধবিমানের ওপর বিশেষ ও কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন।
কঠোর থিওরিটিক্যাল বিষয়াদি শেখার পাশাপাশি তিনি ইমার্জেন্সি প্রসিডিউর ও সিমুলেটর সেশনে অংশ নেন। এরপর দুই সিটের বিমানে প্রশিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত উড্ডয়ন শেষ করে তিনি দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করেন।
চলতি বছরের ৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে তিনি এককভাবে ৪১ মিনিটের জন্য একটি এক সিটের গ্রিপেন যুদ্ধবিমান সফলভাবে পরিচালনা করেন।
রাজা মহা বাজির্যালংকর্ন স্বয়ং উপস্থিত থেকে তাঁর এই ঐতিহাসিক উড্ডয়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সফল উড্ডয়ন শেষে রাজা নিজেই তাঁকে গ্রিপেন অর্ডারের মেডেল পরিয়ে সম্মানিত করেন।
এই ঐতিহাসিক অর্জনের ঠিক ছয় দিন পর, অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর তিনি নতুন এক দায়িত্বে অবতীর্ণ হন। আন্তর্জাতিক আইস হকি ফেডারেশনের নারী গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি অফিশিয়াল সফরে যান।
ওই দিন তিনি নিজেই ক্যাপ্টেন বা অধিনায়ক হিসেবে রাজকীয় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমান চালিয়ে ব্যাংকক ত্যাগ করেন। এই বিমানটি চালিয়ে তিনি জাপানের হোক্কাইডো ভ্রমণ করেন।
জাপান সফর অত্যন্ত সফলভাবে শেষ করে তিনি পুনরায় বিমান চালিয়ে নিরাপদে ব্যাংককে ফিরে আসেন। তাঁর এই বহুমুখী দক্ষতা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসার সৃষ্টি করেছে।
সাধারণ কেবিন ক্রু থেকে শুরু করে রানি এবং পরবর্তীতে পেশাদার ফাইটার পাইলট হিসেবে তিনি বারবার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৭৮ সালের ৩ জুন থাইল্যান্ডের সোংকলা প্রদেশের হাত ইয়াইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান ও প্রাথমিক জীবন সাধারণ পরিবেশেই কেটেছিল।
শিক্ষাজীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ২০০০ সালে অ্যাসাম্পশন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমিউনিকেশন আর্টসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এই শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁর পরবর্তী জীবনের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর