নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত অধ্যবসায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিগ্রি প্রদান এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগের পরেও কেন দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ বেকারত্বের শিকার হচ্ছে, তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত শিক্ষার এই সংকট বলতে শুধু পড়াশোনায় ছাত্রছাত্রীদের অনীহা, শিক্ষকদের অদক্ষতা কিংবা কর্মসংস্থানের অভাবের দিকটিকেই সামনে আনা হয়; কিন্তু গভীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, এত প্রতিষ্ঠান, বিপুল পরিমাণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সরকারি বিনিয়োগ থাকার পরও কেন শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা ও কাজের উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারছে না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। এই সংকটের মূল কারণ উদ্ঘাটন করতে হলে কেবল শিক্ষার্থীদের একক দায়িত্বের কথা না ভেবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা ও সামগ্রিক দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষার মান ও ব্যবস্থার ত্রুটি বুঝতে হলে সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফলগুলোকে একটি বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখতে হবে। গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫২.১২ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২৫ সালের ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২০২৬ সালে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জনে ঠেকেছে এবং একই সঙ্গে দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এই করুণ পরিসংখ্যান কেবল ছাত্রছাত্রীদের ব্যর্থতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে না, বরং এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাদানের সামগ্রিক মান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাই জোরালোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যদিও পাসের হার কমলেই সামগ্রিক শিক্ষার মান কমেছে এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হুট করে টানার সুযোগ নেই, কারণ এক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, মূল্যায়নের কঠোরতা কিংবা অন্যান্য বাহ্যিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হয়; তবে পরপর এমন নিম্নমুখী ফলাফল এবং শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না।
শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের কার্যকারিতার প্রশ্নটি এই ব্যবস্থার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলাদেশে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের মাধ্যমে মেধাবী কর্মকর্তাদের সরকারি কলেজের শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, যেখানে প্রবেশের মূল ভিত্তি হলো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য ও নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা। কিন্তু এখানে একটি গভীর প্রশ্ন থেকেই যায় যে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানেই কি একজন ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অত্যন্ত দক্ষ, অনুপ্রাণিত ও কার্যকর শিক্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন? বাস্তবিক অর্থে একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে শুধু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকলেই চলে না, বরং তাঁকে নিখুঁতভাবে বুঝতে হয় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে, কেন শেখে, তাদের চিন্তাশক্তি কীভাবে প্রসারিত হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের কর্মজগৎ কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও একজন শিক্ষকের সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।
কোনো শিক্ষক যদি বছরের পর বছর একই গতানুগতিক পদ্ধতিতে পাঠদান চালিয়ে যান, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা বা নতুন কিছু অনুসন্ধানের স্পৃহাকে উৎসাহিত না করেন এবং নিজের পাঠদানের কৌশল উন্নত করার কোনো তাগিদ না অনুভব করেন, তবে কেবল তাঁর আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। এর মানে এই নয় যে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে; বরং মূল প্রশ্নটি হলো সরকার তাঁদের নিয়োগ প্রদানের পর নিয়মিতভাবে তাঁদের পেশাগত দক্ষতা, পাঠদানের কার্যকারিতা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার প্রকৃত ফলাফল মূল্যায়ন করছে কি না। শিক্ষক নিয়োগের সাফল্য কেবল কতজন কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশ করলেন তা দিয়ে মাপা যায় না, বরং তাঁদের মাধ্যমে দেশের কতসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে জ্ঞান ও কর্মোপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে, সেটি দিয়েই তাঁদের প্রকৃত সফলতা বিচার করা আবশ্যক।
উচ্চশিক্ষার স্তর এবং কর্মসংস্থানের সংকট বিবেচনা করলে পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল ও অস্বস্তিকর ঠেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারের হার ছিল ১৩.৫৪ শতাংশ, যার সংখ্যাগত রূপ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক বেকার। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের তুলনামূলক বিশ্লেषণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যেই বেকারত্বের এই হার ছিল সর্বোচ্চ। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশদ পড়াশোনা শেষ করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে যান, তখনই তাঁর সামনে এই নির্মম সত্য উন্মোচিত হয় যে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে বর্তমান বাজারের চাহিদার ন্যূনতম মিল নেই। কখনো দেখা যায় নির্দিষ্ট বিষয়ের চাকরির বাজার অত্যন্ত সীমিত, কখনো প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতার মারাত্মক অভাব রয়েছে, আবার কখনো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নতুন কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগই তৈরি হচ্ছে না।
সংক্ষেপে এই পরিস্থিতির অর্থ দাঁড়ায় যে, একজন শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করার আগেই তাঁর অর্জিত শিক্ষার ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এটি কেবল কোনো একক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উচ্চশিক্ষার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের মধ্যকার মারাত্মক সমন্বয়হীনতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য এটিও মনে রাখা দরকার যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের মূল লক্ষ্য কেবল সরাসরি চাকরি তৈরি করা নয়; কারণ সমাজ, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, গবেষণা ও জ্ঞানের সামগ্রিক বিকাশেও উচ্চশিক্ষার অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। তা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে কর্মজীবনের বাস্তব চাহিদা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই সামগ্রিক অবস্থার দায়ভার সরকার ও শিক্ষা প্রশাসনের ওপরও সমানভাবে বর্তায়। রাষ্ট্র শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন করছে এবং শিক্ষা খাতে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে; কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঠিক ফলাফল নিয়মিতভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। শিক্ষক নিয়োগের সময় কেবল প্রাথমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরীক্ষার নম্বর দেখা হলেও নিয়োগের পরবর্তী সময়ে ওই শিক্ষক কতটা ফলপ্রসূভাবে পাঠদান করছেন, শিক্ষার্থীদের শেখার মান কতদূর উন্নত হলো এবং তারা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে কি না, সেগুলোর মূল্যায়ন কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে? একইভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে কত শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন, সেই স্নাতকদের বর্তমান কর্মসংস্থানের অবস্থা কেমন এবং আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হতে পারে, এই সমস্ত বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বা উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা কতটা সাজানো হচ্ছে?
যদি এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার না থাকে, তবে কেবল নতুন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, নতুন বিভাগ খোলা কিংবা নামমাত্র আরও বেশি ডিগ্রি বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কখনো দূর করা সম্ভব হবে না। সরকারি শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও নিজেদের ভূমিকা কেবল চাকরির পদোন্নতি, প্রশাসনিক ক্ষমতাচর্চা এবং ব্যক্তিগত কেরিয়ার গড়ার মধ্যেই সীমিত রাখলে চলবে না, বরং তাঁদের পেশাগত কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রে রাখতে হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মেধার প্রকৃত বিকাশ। একই সঙ্গে তাঁদের এই কাজের জন্য যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বটিও রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকেই পালন করতে হবে।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত ও অভাবনীয় প্রসারের ফলে কর্মজগতের চাহিদা প্রতিনিয়ত অভাবনীয় গতিতে বদলে যাচ্ছে। বহু প্রচলিত কাজের ধরন আজ বিলুপ্তির পথে, অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন সব পেশা ও দক্ষতার ক্ষেত্র। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের কেবল গতানুগতিক পাঠ্যবইয়ের মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে কর্মজীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর