নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে বিপুল পরিমাণে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও সেই অনুপাতে প্রশস্ত করা হয়নি কোনো সড়ক। যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মানুষের চলাচলে তীব্র স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে এবং গাড়িগুলোর অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, সামান্য পাঁচ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের নাগরিক কষ্টের মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি মারাত্মকভাবে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিও।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৭৮৭ সালে এই জনপদের গোড়াপত্তন হওয়ার পর ১৮৬৯ সালে এটি একটি পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে এটিকে বিভাগীয় শহর এবং ২০১৮ সালে সিটি করপোরেশনের উন্নীত করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় গত ১৪ অক্টোবর এই সিটি করপোরেশনের আট বছর পূর্তি হয়েছে। বর্তমান সময়ে মোট ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে পুরো শহর এলাকা গঠিত হয়েছে, যেখানে নগরায়ণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চললেও সে অনুযায়ী কোনো পরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি।
বর্তমান বাস্তবতায় গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া মোড়, নতুনবাজার এবং পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় যানজটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলোর সড়কগুলো অত্যন্ত সরু হওয়ায় যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের দারুণ হিমশিম খেতে হয়। শহরের ভেতরে বিভিন্ন উচ্চতার ভবন এবং চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও দুঃখজনকভাবে সড়কগুলোর প্রশস্ততা আগের মতো সংকীর্ণই রয়ে গেছে। এসব নানা কারণের সামগ্রিক প্রভাবে প্রাচীন এই শহরটি দিন দিন অত্যন্ত ঘিঞ্জি একটি জনপদে পরিণত হচ্ছে।
বিভিন্ন ভবন নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে চারপাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা না রেখেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু স্থাপনা সরাসরি মূল সড়কের পাশ ঘেঁষে নির্মাণ করার ফলে পরিস্থিতির আরও বেশি অবনতি ঘটেছে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে এই শহরের বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৫৭১টি এবং সাততলার বেশি উচ্চতার ভবন ছিল মাত্র ২৭০টি। পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে ৪ হাজার ৯৩৯টি এক থেকে সাততলা ভবন এবং আরও ৫৩টি আট থেকে বাইশ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। এরপর চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত সময়ে নতুন করে এক থেকে সাততলা বিশিষ্ট ৯৯৫টি এবং আটতলা বা তার বেশি উচ্চতার ৭৯টি নতুন ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এই সমস্ত নতুন এবং পুরোনোকরোনা মিলে বর্তমানে এই শহরে এক থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবনের মোট সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৫০ হাজার ৫৬৫টিতে এবং আট থেকে বাইশ তলা পর্যন্ত সুউচ্চ ভবনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ৪০২টিতে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের এই পুরো পরিস্থিতির ব্যাপারে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর–পরিকল্পনাবিদ মানস কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে জানিয়েছেন যে, তাঁদের দপ্তরে নিয়োজিত সীমিত সংখ্যক জনবল দিয়েই সার্বিক তদারকি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁর মতে এখানকার সাধারণ মানুষের একটি বড় সমস্যা হলো যে, কাউকেই কোনো ধরনের জোর প্রয়োগ করে সঠিক নিয়ম মানানো সম্ভব হয় না।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান জানিয়েছেন যে, তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময় ধরে এবং তিনি চেষ্টা করছেন যাতে শহরের আর কোনো নতুন ক্ষতি না হয়। তিনি আরও বলেন, অতীতে কোনো বহুতল ভবন যদি সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে নির্মিত হয়ে থাকে, তবে সেই ভবন নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন তাঁদেরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে এসে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা কিংবা আস্ত একটি বহুতল ভবন ভেঙে ফেলা অত্যন্ত অমানবিক একটি কাজ হবে। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো ভবনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণের শতভাগ চেষ্টা তাঁরা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শহরের ভেতরের কিছু সড়ক অস্বাভাবিকভাবে সরু হওয়ার কারণে প্রায়শই তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, যেহেতু বর্তমান বিদ্যমান সড়কগুলো কোনোভাবেই প্রশস্ত করা সম্ভব নয়, তাই বিকল্প হিসেবে নতুন সড়ক নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে শহরের ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর লক্ষ্যে পুরো নগরায়ণ প্রক্রিয়াটি বিকেন্দ্রীকরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাদের হাতে রয়েছে। বিশেষ করে শহরের বর্ধিত এলাকার চারিপাশে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার বিষয়টি তারা গভীরভাবে বিবেচনা করছেন, যাতে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম খরচে নিজেদের বাড়ি নির্মাণ করতে পারে এবং সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে শহরের ভেতরে মুখ করতে না হয়।
অপরিকল্পিত এই নগরায়ণের লাগাম টেনে ধরতে গত ১৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে নবগঠিত ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। নগর এলাকার যেকোনো ভবন নির্মাণের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করার একক দায়িত্ব এখন এই কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই নতুন চেয়ারম্যান জানিয়েছেন যে, পুরো নগরীকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিভিন্নমুখী যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
অপরদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল ইসলাম মনে করেন যে, একটি বিভাগের প্রধান শহর হিসেবে এখানকার সড়কগুলোর প্রশস্ততা আরও অনেক বেশি থাকা উচিত ছিল। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান এই সড়কগুলোর সর্বোচ্চ এবং সঠিক ব্যবহারের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সকল ধরনের দাপ্তরিক কাজ করে যাচ্ছেন। বিভাগীয় শহর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরপরই একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বর্তমান সড়কগুলো বড় করতে গেলে প্রচুর অবকাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তরফ থেকে যদি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কোনো নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়, কেবল সেই ক্ষেত্রেই সড়কগুলো প্রশস্ত করার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। যদিও এই মুহূর্তে তাদের দপ্তরে এসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর