ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নব্বইয়ের দশকের অ্যাকশন আইকন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যামের বর্ণাঢ্য জীবন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 18, 2026 ইং
নব্বইয়ের দশকের অ্যাকশন আইকন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যামের বর্ণাঢ্য জীবন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ব্যালেরিনা সুলভ শারীরিক নমনীয়তা, মার্শাল আর্টে পারদর্শিতা এবং চোখধাঁধানো স্প্লিটের কারণে গত শতাব্দীর শেষভাগে অ্যাকশন ঘরানার চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র এক আসন তৈরি করেছিলেন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম। বেলজিয়ামের এক সাদামাটা পরিবার থেকে রূপালি পর্দার বৈশ্বিক তারকা হয়ে ওঠার এই অভিযাত্রা কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, বরং জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েও তিনি বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় নিজের অবিচল অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনয়শিল্পী আছেন, যাদের পরিচয় করিয়ে দিতে দীর্ঘ কোনো ভূমিকার প্রয়োজন পড়ে না। দুই দিকে পা ছড়িয়ে দেওয়া সেই অবিশ্বাস্য স্প্লিট, মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা কিংবা বিপদের মুখে স্থির অভিব্যক্তি—জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যামকে স্মরণ করতে এই দৃশ্যগুলোই যথেষ্ট। আশির দশকের সমাপনী পর্ব থেকে নব্বইয়ের দশক জুড়ে মার্শাল আর্টভিত্তিক মারপিটধর্মী চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় এক মুখ ছিলেন তিনি।

আজ ১৮ অক্টোবর এই বিখ্যাত অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৬০ সালের এই দিনে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরের কাছাকাছি বার্খেম-সাঁত-আগাথ এলাকায় জন্ম নেন জ্যঁ-ক্লদ ক্যামিল ফ্রাঁসোয়া ভ্যান ভারেনবার্গ, যাকে সারা দুনিয়া জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম হিসেবে চেনে। তবে এই খ্যাতি এবং পর্দার মারকাটারি পরিচয়ের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ইউরোপ থেকে সুদূর আমেরিকায় বড় তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এক তরুণের দীর্ঘ ও কঠোর লড়াই, যাকে শুরুতে তীব্র অর্থসংকট, বর্জন ও চরম অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

শৈশবে ভ্যান ড্যাম বেশ লাজুক ও রোগাটে গঠনের এক কিশোর ছিলেন এবং তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাসেরও যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। ছেলের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক জোর বাড়াতে তাঁর পিতা তাঁকে মাত্র এগারো বছর বয়সে কারাতে প্রশিক্ষণে ভর্তি করিয়ে দেন। প্রশিক্ষক ক্লদ গেৎজের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তাঁর লড়াইয়ের কলাকৌশল চর্চা, যার ফলে ধীরে ধীরে তাঁর শরীর, মানসিকতা ও জীবনযাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

কারাতের অনুশীলনের পাশাপাশি শরীর গঠন ও বডিবিল্ডিংয়েও গভীর মনযোগ দেন ভ্যান ড্যাম। তবে তাঁর সামগ্রিক প্রশিক্ষণের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল ব্যালে নৃত্য, যেখানে তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে ধ্রুপদি নৃত্যের তালিম নিয়েছিলেন। বাহ্যিকভাবে কারাতে ও ব্যালে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হলেও পর্দায় তাঁর মূল শক্তির জায়গা হয়ে দাঁড়ায় এই দুইয়ের নিখুঁত সমন্বয়, যা তাঁকে চমৎকার শারীরিক ভারসাম্য, নমনীয়তা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জনে সাহায্য করেছিল।

কৈশোরেই কারাতে খেলায় দারুণ দক্ষতা অর্জন করে আঠারো বছর বয়সে ব্ল্যাক বেল্ট লাভ করেন ভ্যান ড্যাম। ইউরোপীয় অঙ্গনের বিভিন্ন কারাতে প্রতিযোগিতাতেও তাঁর সাফল্য অর্জিত হয়। শরীরচর্চায় তাঁর এমন গভীর অনুরাগ ছিল যে তিনি বেলজিয়ামে নিজেই একটি জিমনেসিয়াম চালু করেন এবং ব্যবসা ভালো চলা সত্ত্বেও তাঁর স্বপ্ন কেবল নিজের দেশ কিংবা জিমের চৌহদ্দিতে আটকে থাকেনি, বরং তিনি সেলুলয়েডের নায়ক হতে চেয়েłেন।

আশির দশকের সূচনালগ্নে সামান্য কিছু অর্থ এবং সীমিত ইংরেজি ভাষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখেন ভ্যান ড্যাম। সে সময় হলিউডে প্রতিষ্ঠিত অ্যাকশন তারকাদের প্রচণ্ড আধিপত্য ছিল এবং সিলভেস্টার স্ট্যালোন, আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার কিংবা চাক নরিসের মতো তারকাদের ভিড়ে নিজের জায়গা করে নেওয়া ছিল অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু হাল না ছেড়ে জীবিকার প্রয়োজনে কখনো পিৎজা সরবরাহকারী, কখনো ট্যাক্সিচালক আবার কখনো নাইট ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন তিনি।

১৯৮৪ সালে খ্যাতনামা অ্যাকশন তারকা চাক নরিসের সঙ্গে পরিচয় হয় ভ্যান ড্যামের এবং তাঁর মার্শাল আর্টের কৌশল নরিসের নজর কাড়ে। নরিসের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তাঁর জন্য চলচ্চিত্রে প্রবেশের দরজা কিছুটা উন্মুক্ত হয় এবং ছোটখাটো চরিত্র ও স্টান্টের কাজের পর অবশেষে বড় সুযোগের জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়।

১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নো রিট্রিট, নো সারেন্ডার’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন ভ্যান ড্যাম, তবে এই কাজটি তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দিতে পারেনি। হলিউডে নিজের স্থায়ী ভিত্তি গড়তে তখনো এমন একটি চলচ্চিত্রের প্রয়োজন ছিল, যেখানে তাঁর শারীরিক কসরত ও পর্দার উপস্থিতি পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে, আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আসে ১৯৮৮ সালে।

১৯৮৮ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘ব্লাডস্পোর্ট’ চলচ্চিত্রের, যা ফ্র্যাঙ্ক ডাক্সের বাস্তব জীবনের কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং এতে ভ্যান ড্যাম অভিনয় করেন ফ্র্যাঙ্ক ডিউকস নামক এক মার্শাল আর্ট যোদ্ধার চরিত্রে। গোপন এক আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের প্রতিযোগিতা কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে একের পর এক হাতাহাতি মারপিট এবং শারীরিক দক্ষতার নান্দনিক প্রদর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।

চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ছিল এবং প্রযোজক মেনাহেম গোলান এটি সরাসরি ভিডিওতে ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন বলে ভ্যান ড্যামের জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তা সত্ত্বেও নিজের অভিনীত চলচ্চিত্রের সাফল্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে এর সম্পাদনা প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য জোর চেষ্টা চালান এই অভিনেতা।

পরিশেষে ‘ব্লাডস্পোর্ট’ তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয় এবং দর্শকরা পর্দায় এমন এক অ্যাকশন তারকাকে খুঁজে পান যিনি শুধু পেশিবহুলই নন, বরং অতি দ্রুতগতির লড়াইয়ে দক্ষ ও অবিশ্বাস্য রকম নমনীয়। এই চলচ্চিত্রের অভাবনীয় সাফল্যের পর ভ্যান ড্যামের সম্মুখে সম্ভাবনার নতুন সব দিগন্ত উন্মোচিত হতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালে ‘কিকবক্সার’ ও ‘সাইবর্গ’ এবং ১৯৯০ সালে ‘লায়নহার্ট’ ও ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন ছবির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মাসলস ফ্রম ব্রাসেলস’ বা ব্রাসেলসের পেশিবহুল মানব ডাকনামটি, যার মাধ্যমে তাঁর শারীরিক শক্তির পাশাপাশি বেলজিয়ামের ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা শেকড়ের পরিচয়ও প্রকাশ পেত।

নব্বইয়ের দশকটি ছিল ভ্যান ড্যামের কর্মজীবনের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য সময়গুলোর একটি। ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ডাবল ইমপ্যাক্ট’ চলচ্চিত্রে যমজ দুই ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দারুণ চমক সৃষ্টি করেন এবং ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চরিত্র ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি মারপিটের দৃশ্যেও দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

১৯৯২ সালে রোলান্ড এমেরিখের পরিচালনায় মুক্তি পায় সায়েন্স ফিকশন ঘরানার ছবি ইউনিভার্সাল ‘সোলজার’, যেখানে ভ্যান ড্যামের সহশিল্পী ছিলেন ডলফ লুন্ডগ্রেন। সামরিক পরীক্ষায় মৃত সৈনিকদের পুনরুজ্জীবিত করে বিশেষ যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার গল্পভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি দারুণ বাণিজ্যিক সফলতা অর্জন করে এবং তাঁর পরিচিতি বিশ্বজুড়ে আরও বিস্তৃত হয়।

জন উ পরিচালিত ১৯৯৩ সালের ‘হার্ড টার্গেট’ চলচ্চিত্রটি ভ্যান ড্যামকে হলিউডের বড় বাজেটের অ্যাকশন প্রযোজনায় কাজ করার সুযোগ করে দেয়। হংকংয়ের মারপিটধর্মী ছবির বিখ্যাত এই নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে তিনি বন্দুকযুদ্ধ, দ্রুত গতির সম্পাদনা ও মার্শাল আর্টের অভিনব মিশ্রণে নতুন ধারার অ্যাকশন পরিবেশন করার সুযোগ পান।

এরপর ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সাহায্যে সময় ভ্রমণ ও অপরাধ দমনের গল্প নিয়ে তৈরি ‘টাইমকপ’, যা তাঁর ক্যারিয়ারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বক্স অফিসে অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে পরিগণিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালেও ‘সাডেন ডেথ’ নামক আরও একটি দর্শকনন্দিত চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখতে পান ভক্তরা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের মধ্যে আটক ১৫৯ জনকে মুক্তি দিয়েছে দেশটি

ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের মধ্যে আটক ১৫৯ জনকে মুক্তি দিয়েছে দেশটি