ঢাকা | বঙ্গাব্দ

জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৩৮ কোটি ডলার ছাড়াল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৩৮ কোটি ডলার ছাড়াল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বিশ্বের চার নম্বর অর্থনীতির দেশটি প্রতি বছর সব মিলিয়ে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক কারবার পরিচালনা করে থাকে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞের মাঝে বাংলাদেশ ও পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির মধ্যকার আমদানি-রপ্তানি বা সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ মাত্র তিনশো আটাশি মিলিয়ন ডলারের ঘরে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে এত কম অঙ্কের আদান-প্রদান সত্ত্বেও পূর্ব এশিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্রটি আমাদের দেশের পণ্যের নবম শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। মূলত মোটরযান, বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, ইস্পাত ও লোহা আমাদের দেশে বেশি পরিমাণে নিয়ে আসা হয়।

একসময় ধারণা করা হতো যে এই রাষ্ট্রটি এক দিন গ্লোবাল অর্থনীতির সিংহাসনে বসবে। বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা বিশাল এক শিল্পশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। একসময় মোটরগাড়ি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং প্রযুক্তি বাজারে তাদের প্রায় একচ্ছত্র একক প্রভাব বজায় ছিল।

আমাদের দেশের বাজারেও একসময়ে এই রাষ্ট্রের গাড়ি এবং ইলেকট্রনিকস মানেই ছিল দারুণ এক আস্থার প্রতীক। সে দেশের দুই চাকার বাহন আমাদের দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াত। সেই সময়ে ব্যক্তিগত যানের কথা বললেই মানুষের মনে নির্দিষ্ট ওই ব্র্যান্ডের নাম ভেসে উঠত এবং রঙিন বাক্স সদৃশ টেলিভিশন বললেই নির্দিষ্ট আরেকটি নাম মাথায় আসত।

তবে শেষ পর্যন্ত আমেরিকার অবস্থান পেছনে ফেলে তাদের পক্ষে শীর্ষ স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বরং মাথাপিছু আয়সহ নানা সূচকে এই শিল্পোন্নত দেশের উল্টো পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। গত শতকের শেষ দশকের অর্থনৈতিক ধীরগতি, বয়স্ক জনসংখ্যার হার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং ড্রাগনের মতো প্রতিবেশীর উত্থানের ফলে তথ্যপ্রযুক্তির মাঠে পিছিয়ে পড়া—এই সবকিছুর কারণে সেই পুরনো স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।

এত চাপ ও নানা প্রতিকূলতার পরও এই দেশটি এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে রয়েছে। তারা বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির মর্যাদা ভোগ করছে। প্রায় চার লাখ চুয়াল্লিশ হাজার বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল অর্থনীতির সঙ্গে পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো তথা ইপিবি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পঁচিশ সালের হিসাব ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় লেনদেন বৃদ্ধি পেয়ে তিনশো আটাশি মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্রটি এখন আমাদের দেশের বৈদেশিক পণ্য পাঠানোর দিক থেকে নবম স্থানে অবস্থান করছে। যদিও উল্টো দিক থেকে তাদের পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অবস্থান ঠিক কোন জায়গায়, সেই সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জানা যায়নি।

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী আজ সোমবার চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে গিয়েছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বেশি গতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল ধারণা করছে।

এবার একনজরে দেখে নেওয়া যাক পূর্ব এশিয়ার এই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মোট লেনদেনের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং তাদের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার রাষ্ট্রগুলো কোনগুলো।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পঁচিশ সালে দেশটির পণ্য পাঠানোর পরিমাণ ছিল প্রায় সত্তর হাজার আটশো পঞ্চাশ কোটি মার্কিন ডলার এবং বিদেশ থেকে পণ্য আনার পরিমাণ ছিল বাহাত্তর হাজার পাঁচশো পঞ্চাশ কোটি ডলার। অর্থাৎ তাদের মোট পণ্য লেনদেনের পরিমাণ প্রায় এক লাখ তেতাল্লিশ হাজার চারশো কোটি ডলাতে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এই পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।

শুধু পণ্য নয়, সেবা খাতের আন্তর্জাতিক কারবারও দেশটিতে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। পঁচিশ সালে তাদের সেবা পাঠানোর হার সাত দশমিক দুই শতাংশ বেড়ে প্রায় চব্বিশ হাজার ছয়শো দশ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। একই সময়ে সেবা আমদানির হার সাত দশমিক চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ছাব্বিশ হাজার নয়শো কুড়ি কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে পঁচিশ সালের হিসাবে পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সর্বমোট আন্তর্জাতিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ সাতানব্বই হাজার নয়শো ত্রিশ কোটি মার্কিন ডলার।

রাষ্ট্রটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান পণ্য প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী দেশ হলেও তাদের বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। বিশেষ করে কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নানা রকমের অশুল্ক বাধা বা প্রতিবন্ধকতা বজায় রেখেছে তারা। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চব্বিশ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ জুগিয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য খাত।

তাদের পণ্য পাঠানোর মূল ক্ষেত্র হলো মোটরযান ও প্রযুক্তিপণ্য। পঁচিশ সালে তারা যত পণ্য পাঠিয়েছে, তার চৌদ্দ দশমিক তিন শতাংশ ছিল কেবল মোটরগাড়ি। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সার্কিট, সেমিকন্ডাক্টর তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, স্বর্ণ, গাড়ির নানা যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভারী যন্ত্রপাতি তারা বাইরে পাঠায়। অপরদিকে বিদেশ থেকে পণ্য আনার বড় খাত হলো জ্বালানি ও প্রযুক্তিপণ্য। পঁচিশ সালে তারা যত পণ্য এনেছে, তার আট দশমিক পাঁচ শতাংশ ছিল পরিশোধিত নয় এমন জ্বালানি তেল। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য আমদানির মধ্যে গ্যাস, টেলিফোন, ইলেকট্রনিক সার্কিট, কম্পিউটার ও কয়লা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তাদের সবচেয়ে বড় বিক্রির বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। পঁচিশ সালে তাদের মোট প্রেরিত পণ্যের আঠারো দশমিক ছয় শতাংশ গেছে আমেরিকার বাজারে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন, যেখানে গেছে সতেরো শতাংশ পণ্য। এরপর ক্রমানুসারে রয়েছে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং হংকং। তাদের বিদেশ থেকে পণ্য আনার সবচেয়ে বড় উৎস চীন। পঁচিশ সালে মোট আমদানির তেইশ দশমিক ছয় শতাংশ এসেছে প্রতিবেশী এই দেশ থেকে। এ ছাড়া আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান ও আরব আমিরাত থেকেও প্রচুর পরিমাণ পণ্য তারা নিজেদের দেশে এনেছে।

আমেরিকা ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

আমেরিকা ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা হলো তাদের গাড়ি ও শিল্পপণ্য বিক্রির বিশাল এক বাজার। পক্ষান্তরে চীন তাদের যেমন বড় বিক্রির বাজার, তেমনই শিল্পপণ্য আমদানির প্রধান উৎস। এই কারণে অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি সচল রাখার স্বার্থে এই দুই পরাশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য ভীষণ জরুরি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অনন্য গুরুত্ব রয়েছে। চীনের পর এশিয়া অঞ্চলে ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী এই দেশটি। উনিশ সালে দুই পক্ষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হয়। এ ছাড়া তারা আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতেও সই করেছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ এই চুক্তির অংশীদার। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ত্রিশ শতাংশের সমান।

তাদের সামগ্রিক বাণিজ্যচিত্রে মূলত দুটি দিক অত্যন্ত স্পষ্ট। একদিকে মোটরগাড়ি ও প্রযুক্তিপণ্য প্রেরণে তাদের শক্ত অবস্থান দৃশ্যমান, অন্যদিকে জ্বালানি ও শিল্প-উপকরণের জন্য আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যভিত্তি, প্রধান অংশীদারদের চাহিদা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো পরিবর্তন তাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অপ্রাপ্তির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে বিশেষ কল্যাণ

অপ্রাপ্তির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে বিশেষ কল্যাণ