নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন একটি তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এবং গত সোমবার সমাপ্ত হওয়া একটি সাম্প্রতিক জনমত জরিপের ফলাফল হাতে এসেছে। সেই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে সাধারণ মানুষের জনসমর্থন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দফায় তাঁর সমর্থন বেড়ে গিয়ে বর্তমানে ৩২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ঠিক আগের সপ্তাহে এই সমর্থনের হার রেকর্ড পরিমাণ সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছিল। তবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে হিসাব করলে তাঁর জনপ্রিয়তা ১ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখেই মূলত এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছিল। মূলত এই আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে যে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক দলের হাতে চলে যাবে।
এদিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁরা বর্তমানে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস তথা প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট উভয় কক্ষেই নিজেদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখতে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সারা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে টানা পাঁচ দিন ধরে এই জরিপের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সাধারণ ভোটারদের বেশ কিছু সাধারণ প্রশ্নও করা হয়েছিল। ভোটারদের কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তাঁরা আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য ঠিক কোন রাজনৈতিক দলটিকে নিজেদের পছন্দ হিসেবে বেছে নেবেন। এর জবাবে যেসব নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন, তাঁরা রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় ডেমোক্র্যাট দলটির প্রতি বেশি ঝোঁক দেখিয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে এই সমর্থনের পরিমাণ ছিল ৩৬ শতাংশ।
এ ছাড়া প্রায় ১১ শতাংশ ভোটার এমন ছিলেন যাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো মন্তব্য করতে পারেননি। তাঁরা জানিয়েছেন যে যদি আজকেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে কাকে ভোট দেবেন সেই বিষয়টি সম্পর্কে তাঁদের নিজেরই কোনো ধারণা নেই।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এই দুই বড় দলের মধ্যবর্তী ব্যবধান ছিল ১১ শতাংশ পয়েন্ট। গত ১৯ অক্টোবর তারিখে রয়টার্স ও ইপসোসের ঠিক যে জরিপটি প্রকাশিত হয়েছিল, বর্তমান এই ব্যবধান তার তুলনায় ১ শতাংশ পয়েন্ট কম বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এই একেবারে নতুন জরিপটিতে অংশ নেওয়া সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভোটারদের কাছেও পুনরায় জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তাঁরা শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে ঠিক কোন দলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে পারেন।
এই সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের মতামত এবং উত্তরগুলো যখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া হলো, তখন জাতীয় রাজনীতির সার্বিক চিত্র কিছুটা ভিন্নরূপ ধারণ করল। জাতীয় পর্যায়ে দুই প্রধান দলের মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে বলেই মনে হয়েছে। তবে এর মধ্যেও ৯ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। কারণ এই ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে জনসমর্থন গিয়ে ঠেকেছে ৫০ শতাংশে। অন্যদিকে তাদের প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান দলটির পক্ষে সমর্থনের এই হার রয়েছে ৪১ শতাংশে।
রিপাবলিকান দলটির জন্য কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা অত্যন্ত বড় ধরনের একটি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে খোদ রাষ্ট্রপতির ওপরও। এর ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের মেয়াদের শেষ দুই বছরের শাসনকালে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
জনগণের মাঝে যে বিশেষ ধরনের জরিপটি চালানো হয়েছে তাকে সংবাদমাধ্যমের ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘জেনেরিক ব্যালট জরিপ’। এটি মূলত একধরনের জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপ। এই ধরনের জরিপে যারা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, তারা কংগ্রেসে ঠিক কোন রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান, তারই একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে।
এ ধরনের জরিপগুলো মূলত গোটা জাতীয় পর্যায়ের সাধারণ জনগণের সাধারণ মতামত সম্পর্কে আমাদের একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম। তবে এর একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতার ভেতরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সবসময় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। অথচ মার্কিন রাজনীতিতে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এই অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। আর এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির কিছু নিজস্ব কাঠামোগত সুবিধাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নেওয়ার বেশ ভালো একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা এ কথাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে সিনেটের লড়াইয়ে জয়লাভ করাটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ কঠিন কাজ হবে।
এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয় হলো যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবে ঠিক কতজন ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
নিজেদের ভোटाধিকার প্রয়োগ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রয়েছে এমন ভোটারদের মধ্যেও কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় ৯ শতাংশ পয়েন্টে বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে রয়েছেন। এই নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সমর্থন রয়েছে ৫৩ শতাংশ। আর ঠিক তার বিপরীতে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে এই সমর্থনের হার রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশের ঘরে।
মার্কিন কংগ্রেসের এবারের এই তীব্র লড়াই মূলত দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির ওপর গভীরভাবে নির্ভর করে আছে বলেই মনে হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলা চালানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। আর ঠিক সে কারণেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতিও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জরিপের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ শতাংশ সাধারণ ভোটার স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে তাদের পারিবারিক জীবনযাত্রার বর্তমান ব্যয় সম্পূর্ণ ভুল পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের দৈনন্দিন খরচ অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে গেছে।
তবে বর্তমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সংকট শুরু হওয়ার ঠিক আগের সময়ের কথা যদি ধরা হয়, তখন রয়টার্স ও ইপসোসের পরিচালিত জরিপে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। তখন ভোটাররা মার্কিন জাতীয় অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকান দলটির ওপরই অনেক বেশি আস্থা রাখতেন এবং তাদেরই বেশি পছন্দ করতেন।
কিন্তু অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় হলো, একদম সর্বশেষ প্রকাশিত এই জরিপটিতে দেখা গেছে যে ৩৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের অর্থনৈতিক নীতিগুলোই তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। অন্যদিকে, এর বিপরীতে মাত্র ৩৩ শতাংশ ভোটার এই নির্দিষ্ট বিষয়ে রিপাবলিকান দলটিকে নিজেদের পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
রয়টার্সের এই জরিপে আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী ও উদগ্রীব হয়ে আছেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্য থেকে ৪৬ শতাংশ ভোটার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে তাঁরা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে দারুণভাবে উৎসাহী। অথচ এই একই বিষয়ে রিপাবলিকান পার্টির মাত্র ৩০ শতাংশ ভোটার একই ধরনের উৎসাহের কথা প্রকাশ করেছেন।
জনসাধারণের মতামত জানার জন্য রয়টার্স ও ইপসোসের এই গুরুত্বপূর্ণ জরিপটি মূলত অনলাইনে সম্পন্ন করা হয়েছিল। এই অনলাইনভিত্তিক জরিপের প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৬৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এই মোট অংশগ্রহণকারীদের ভেতরে ১ হাজার ২৮০ জন ভোটার ছিলেন যাঁরা পূর্ব থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত ছিলেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর