নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী মধ্যবর্তী ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযানের নতুন রূপরেখা তৈরি করছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। এই সম্ভাব্য যৌথ আগ্রাসনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির পরমাণু কেন্দ্রগুলো ছাড়াও বিভিন্ন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার এবং জ্বালানি উৎপাদনের অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানা গেছে। দুই দেশের সরকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্য সার্বিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছে।
আমেরিকার বর্তমান প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সামরিক পদক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সবুজ সংকেত দেবেন কি না, তা নিয়ে এখনো দোলাচল রয়েছে। তবে যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তেহরান ইতিমধ্যে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক সূত্র এবং সামরিক নীতি নির্ধারণের বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে গত বুধবার প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, খুব কম সময়ের ব্যবধানে প্রচণ্ড গতিতে আক্রমণ চালানোর কৌশল নিয়ে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সবিস্তারে মতবিনিময় করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক পরিচালিত পূর্ববর্তী বড় আকারের সামরিক অভিযানে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং এর উল্টো ফল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের মূল্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চরমভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর কাছে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ভান্ডারেও মারাত্মক টান পড়েছে।
আমেরিকার কিছু সামরিক কৌশলবিদের মতে, একটানা তিন দিন ধরে ইরানি ভূখণ্ডে সর্বাত্মক ও তীব্র প্রকৃতির বিমান হামলা পরিচালনা করা হতে পারে। এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হবে তেহরানের অর্থনীতিকে এতটাই বিপর্যস্ত করে তোলা, যাতে তারা বাধ্য হয়ে সমঝোতার টেবিলে এসে বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক পরিচালিত পূর্ববর্তী বড় আকারের সামরিক অভিযানে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং এর উল্টো ফল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের মূল্য ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চরমভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এবং মার্কিন বাহিনীর কাছে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ভান্ডারেও মারাত্মক টান পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগরের এই দেশটির শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় আট মাস ধরে চলা তীব্র সংঘাত ও রক্তক্ষয়ের পরও বর্তমান ইরানি সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে রয়েছে। দেশটির ওপর আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর নজিরবিহীন অবরোধও তেহরানকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি। সার্বিক এই ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটেই মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী নতুন করে বড় ধরনের আগ্রাসনের ছক কষছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে একাধিকবার বড় ধরনের সামরিক আক্রমণের প্রস্তাব শেষ মুহূর্তে আটকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত অক্টোবরের শুরুর দিকে দুই দেশের সামরিক কমান্ডগুলো হামলার প্রায় শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। এছাড়া নভেম্বরের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তিনটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী, হাজার হাজার মেরিন সেনা, সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান ও বিশেষ কমান্ডো বাহিনী মোতায়েনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বনির্ধারিত সূচি রয়েছে। এই নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি পরাস্ত হন, তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি কিছুদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এমতাবস্থায় একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন করে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বা বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ হবে। এই রাজনৈতিক সমীকরণগুলোও সামগ্রিক হামলার পরিকল্পনায় গভীর প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, নতুন করে যৌথ সামরিক আগ্রাসনের এই সম্ভাব্য আশঙ্কাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগিয়ে দেশের বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বা জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টা চালাতে পারেন নেতানিয়াহু, এমনটাই ধারণা করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ইসরায়েলের খ্যাতনামা রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেম মন্তব্য করেছেন যে, তিনি এই সংকটের সুযোগ নিয়ে একটি জরুরি সরকার গঠনের জোরালো আহ্বান জানাতে পারেন। তবে বিগত সময়ের তুলনায় এবার তিনি নিজ দেশের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গভীর সন্দেহ ও অনাস্থার মুখে পড়বেন।
নতুন এই সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের বিভিন্ন গোপন পারমাণবিক স্থাপনা। এর মধ্যে দুর্গম পাহাড়ের গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘পিক্যাক্স’ কেন্দ্রটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেখানে প্রায় ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের দানবীয় ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা সব বোমার জননী নামক শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। যদিও সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, মূলত ভূপৃষ্ঠে বিস্ফোরিত হওয়ার উপযোগী এই বিশালাকার বোমাটি ভূগর্ভস্থ বা সুড়ঙ্গের ভেতরের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
জ্বালানি উৎপাদনের বিভিন্ন স্থাপনাও এই সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা দেশটির তেল শোধনাগারগুলোকে হামলার আওতা থেকে বাইরে রাখতে চান।
ইরানি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তাদের ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জলযান ও জ্বালানি অবকাঠামোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলেও ধ্বংসাত্মক আঘাত হানা হতে পারে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলার হুমকির কারণে গত বুধবার সৌদি আরবের রিয়াদ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন এমন মার্কিন সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবারকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করেছে ওয়াশিংটন। তেহরানের বিশিষ্ট ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক পেইমান সালেহি এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন যে, চলমান যুদ্ধ আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টির সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে সাধারণ মার্কিন জনগণই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলার হুমকির কারণে গত বুধবার সৌদি আরবের রিয়াদ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন এমন মার্কিন সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবারকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করেছে ওয়াশিংটন।
ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক স্তরের আলোচনা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র বা কার্যক্রমের বিষয়ে ন্যূনতম ছাড় দিতেও মোটেও রাজি নয় তেহরানি কর্তৃপক্ষ। তারা বরং এই প্রস্তাব দিয়েছে যে, প্রাথমিকভাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে মার্কিন প্রশাসন শুরু থেকেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আলোচনার মূল এজেন্ডায় সবার ওপরে রাখতে বদ্ধপরিকর।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল এই বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি যখন দিন দিন আরও বেশি অস্থিতিশীল ও চরম সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তে নতুন করে আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু করলে সামগ্রিক পরিস্থিতির আদতে কী ধরনের উন্নতি সাধিত হবে, তার পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কেউই জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেননি।
ইরানি আলোচনাকারী দলের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি মাত্র তিন দিনের মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ সফলভাবে শেষ করে ফেলার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও আকাশকুসুম ‘কল্পনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, আমাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সামরিক পাল্টা আক্রমণ হবে আরও বহুগুণ বেশি তীব্র, অভিনব সৃজনশীল এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধ্বংসাত্মক ধাঁচের।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর