ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও বেশি ইনিংসে হারের লজ্জায় বাংলাদেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 24, 2026 ইং
অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও বেশি ইনিংসে হারের লজ্জায় বাংলাদেশ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ক্রিকেট বিশ্বে একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে যে রেকর্ড তৈরি হয় ভাঙার জন্য। তবে স্কোরকার্ডে এমন কিছু পরিসংখ্যান যুক্ত হয়, যা কোনো দলের নামের পাশে দেখতে কেউই স্বস্তি পান না এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই লজ্জার বোঝা আরও ভারী হতে থাকে। প্রতিপক্ষ দল একবার ব্যাটিং করে যে সংগ্রহ দাঁড় করায়, দুই ইনিংস মিলিয়েও সেই রান পার করতে না পারার চেয়ে মর্মান্তিক পরাজয় টেস্ট ক্রিকেটে আর কিছু হতে পারে না।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্যাবেরা টেস্টে ইনিংস ও ৩১ রানে পরাজিত হয়ে এই লজ্জার সাগরে ডুবেছে প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়া দল। অজিদের মতো শক্তিশালী ক্রিকেট পরাশক্তির জন্য এমন ফলাফল নিশ্চিতভাবেই একটি বিরাট ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তবে দীর্ঘ ১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় যে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের এই তেতো স্বাদ তাদের কাছে নতুন কিছু নয়।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৪৯ বছরের টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া দল এখন পর্যন্ত ৪১ বার ফলোঅনে পড়েছে এবং ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে মোট ৪৭ বার। এই পরিসংখ্যানটি প্রথম দর্শনে বেশ বড় মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকালে সেই ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। অস্ট্রেলিয়া গত দেড় শতাব্দীতে যতবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে, বাংলাদেশ তার চেয়েও অনেক বেশিবার এই ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে মাত্র ২৬ বছরের সংক্ষিপ্ত টেস্ট ইতিহাসে।

খবরটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটিই চরম সত্য যে, ২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্টের মর্যাদা অর্জন করা বাংলাদেশ দল এ পর্যন্ত মোট ১৬২টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে ঠিক ৪৯টি ম্যাচেই তাদের হার মানতে হয়েছে ইনিংস ব্যবধানে। এর সহজ অর্থ দাঁড়ায় যে, টাইগারদের প্রায় প্রতি তিনটি টেস্ট ম্যাচের একটিতে হারের সবচেয়ে বিব্রতকর চেহারাটি দেখতে হয়েছে।

পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় যে, একুশ শতকে অন্য কোনো ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ ইনিংস ব্যবধানে হারের সংখ্যা ত্রিশের কোঠা ছুঁতে পারেনি। অথচ সেখানে বাংলাদেশের একাই রয়েছে ৪৯টি হার। তবে এই লজ্জাজনক রেকর্ডের বিস্তারিত পর্যালোচনার আগে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ টেস্ট ইতিহাসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট মানেই এক সময় প্রতিপক্ষকে কঠোরভাবে শাসন করার রোমাঞ্চকর সব গল্প। ডন ব্র্যাডম্যানের অবিশ্বাস্য ব্যাট, ডেনিস লিলির আগুনঝরা গতিময় বোলিং, শেন ওয়ার্নের অসাধারণ ঘূর্ণিজাদু কিংবা স্টিভ ওয়াহ ও রিকি পন্টিংয়ের নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য দলের জয়রথ ছিল ক্রিকেট বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। একসময় মনে হতো ক্রিকেটের রাজদণ্ড বুঝি পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার দখলেই রয়েছে।

অথচ সেই পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকেও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ইনিংস ব্যবধানে হারের বেদনা হজম করতে হয়েছে। ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৮ সালের সেই প্রাথমিক সময়ে ইংল্যান্ডের কাছে তারা টানা সাতবার ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৯০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আরও দুইবার এবং তার পরের দশকে আরও দুইবার একই পরিণতি বরণ করে তারা।

বিশেষ করে ১৯১০ থেকে ১৯৫০ সালের দীর্ঘ সময় জুড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত করার একচ্ছত্র অধিকার যেন একমাত্র ইংল্যান্ডের দখলেই ছিল। সে সময় অজিদের একের পর এক টেস্ট সিরিজে লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ব্রিটিশদের বিপক্ষে।

ইংল্যান্ডের সেই একক আধিপত্যের অবসান ঘটে ১৯৭০ সালে। ডারবানের কিংসমিডে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য কোনো দেশের কাছে ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয় অস্ট্রেলিয়া। সেই দলটি আর কেউ নয়, দক্ষিণ আফ্রিকা। কী অদ্ভুত এক সমাপতন যে, ঠিক অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর সেই প্রোটিয়ারা দলই আবার অস্ট্রেলিয়াকে তাদের অতীতের এই পুরোনো লজ্জার কথা স্মরণ করিয়ে দিল।

১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিন দশকে অস্ট্রেলিয়া মোট ১০ বার ইনিংস ব্যবধানে ম্যাচ হেরেছিল। এরপর আশির দশকের শুরু থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তাদের ঝুলিতে জমা হয় আরও ১১টি ইনিংস ব্যবধানে হার। আর তার পরের ২৬ বছরের হিসাব অনুযায়ী তাদের এই হার মাত্র ১০টি। অর্থাৎ, একুশ শতকে ২৮৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ব্যবধানে হারের সংখ্যা মোটে ১০টিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই সাফল্যের বিপরীতে অন্য দেশগুলোর চিত্র বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে হিসাব করলে বাংলাদেশের ঠিক পরেই সবচেয়ে বেশিবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একসময়ে যে ক্যারিবীয় পেস আক্রমণ প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের মনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করত, সেই দলটি এই শতকে ২৪২টি টেস্ট খেলে ২৮ বার ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঠিক পরেই অবস্থান করছে ক্রিকেটের জন্মদাতা দেশ ইংল্যান্ড এবং জিম্বাবুয়ে। এই দুটি দলের নামের পাশেই বর্তমানে সমান ২৭টি করে ইনিংস ব্যবধানে হারের রেকর্ড রয়েছে। তবে এই দুই দলের পরিসংখ্যানের মাঝে রয়েছে আকাশ ও পাতাল ফারাক। কারণ ইংল্যান্ড যেখানে মোট ৩৩৬টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ২৭ বার হেরেছে, সেখানে জিম্বাবুয়ে মাত্র ৯১টি ম্যাচ খেলেই সমান সংখ্যক হারের স্বাদ পেয়েছে।

অন্যান্য টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা তাদের খেলা ২৩৫টি টেস্টের মধ্যে ২৫ বার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে। এছাড়া পাকিস্তান ২১৩টি টেস্টে ১৯টি, ভারত ২৭১টি টেস্টে ১৬টি এবং নিউজিল্যান্ড ২১১টি টেস্ট খেলে মাত্র ১২ বার ইনিংস ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের খেলা ২৪৩টি টেস্টের মধ্যে এই লজ্জার মুখে পড়েছে মোটে ১১ বার।

তুলনামূলকভাবে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস বেশ সংক্ষিপ্ত। আফগানিস্তান দল তাদের খেলা মাত্র ১৪টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে চারবার এবং আয়ারল্যান্ড দল ১৩টি টেস্ট খেলে তিনবার ইনিংস ব্যবধানে হারের শিকার হয়েছে। এই সমস্ত পরিসংখ্যামের পর বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবধানটা নতুন করে মেলানো যেতে পারে।

বর্তমান শতকে অস্ট্রেলিয়া দল ২৮৪টি টেস্ট খেলে মাত্র ১০ বার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ দল মাত্র ১৬২টি টেস্ট ম্যাচ খেলেই ৪৯ বার ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় বরণ করেছে। অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ১২২টি টেস্ট ম্যাচ কম খেলেও টাইগারদের ইনিংস ব্যবধানে হারের সংখ্যা তাদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।

শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, এই একুশ শতকে ভারত, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকা—এই তিনটি দেশ মিলে মোট যতবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে, সেই সংখ্যাটাও বাংলাদেশের এক দলীয় হারের চেয়ে কম। এই তিন শক্তিশালী দলের সম্মিলিত হার মাত্র ৩৯টি, যেখানে বাংলাদেশের একার ঝুলিতেই রয়েছে ৪৯টি লজ্জাজনক হার।

এই অংক ও পরিসংখ্যানগুলো বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের এক অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও নির্মম বাস্তবতাকে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে তোলে। টেস্ট ক্রিকেটের স্থায়ী মর্যাদা পাওয়ার পর ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ২৬টি বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ কিছু স্মরণীয় জয় ও ব্যক্তিগত বহু অসাধারণ কীর্তি উপহার দিয়েছে। কিন্তু পাঁচ দিনের দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করার সক্ষমতা অর্জনে যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে, বর্তমান ছবিটিতে তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচ হেরে যাওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়া দলও অতীতে ম্যাচ হেরেছে। ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ও শক্তিশালী দলগুলোকেও কখনো না কখনো মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। তবে একটি সাধারণ পরাজয় এবং ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের মাঝে যে বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান, তা কেবল একটি স্কোরকার্ডের হিসাব নয়। এটি মূলত একটি দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার ক্ষমতা বনাম প্রতিপক্ষের সামনে প্রায় পুরোপুরি অসহায় আত্মসমর্পণের মধ্যবর্তী তফাত। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থান এখন ঠিক এই কঠিন আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সরকারি স্কুলে ভর্তি নীতিমালায় এক শাখায় সর্বোচ্চ ৫৫ শিক্ষার

সরকারি স্কুলে ভর্তি নীতিমালায় এক শাখায় সর্বোচ্চ ৫৫ শিক্ষার