নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সোমবার সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এলাকায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা রাজপথে নেমে তীব্র প্রতিবাদ জানান। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দিনের শুরুতে আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সকাল সাড়ে নয়টার পর থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতার কারণে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বেশ কিছু এলাকার কারখানায় সাধারণ ছুটির ঘোষণা দেয়।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে নিউএইজ গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা প্রথমে কর্মবিরতি পালন করেন এবং কারখানা চত্বর ছেড়ে সড়কে এসে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁরা দলবদ্ধ হয়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কারখানার সামনে গিয়েও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আশুলিয়া ও সাভার এলাকার বিভিন্ন কারখানার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। সকালের এই সময়ে জিরাবো এলাকার কাঠগড়া সড়কের পাশে বেঙ্গল প্লাস্টিক পাইপস লিমিটেডের কারখানার সামনে চার থেকে পাঁচ শ শ্রমিক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা উক্ত কারখানার দিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং ভেতরের শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানান। জিরাবো থেকে কাঠগড়া সড়কের আশপাশে অবস্থিত অন্যান্য কারখানার সামনেও একইভাবে বিক্ষোভ করে শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আসার ডাক দেওয়া হয়।
জিরাবো এলাকার মিনি সাউদার্ন গার্মেন্টসের একজন সাধারণ শ্রমিক জানান যে তাঁরা স্বাভাবিক কাজ করছিলেন, কিন্তু আন্দোলনকারীদের দল চলে আসার পর কর্তৃপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। কাঠগড়া পুকুরপাড় এলাকাসহ তাঁদের আশেপাশের প্রায় ছয় থেকে সাতটি কারখানায় একই কারণে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং সকাল দশটার দিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের ঘোষবাগ এলাকায় বিভিন্ন কারখানার সামনেও শ্রমিকেরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
উত্তেজিত শ্রমিকেরা একপর্যায়ে প্রধান সড়কে বিদ্যুতের খুঁটি এনে ফেলে রেখে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে অবরোধ করে দেন। তখন পুলিশ সদস্যরা তাঁদের ওপর লাঠিপেটা ও ধাওয়া চালিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে সমর্থ হন।
আন্দোলন চলাকালীন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার একটি পর্যায়ে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের ছোঁড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একজন সদস্য গুরুতর আহত হন এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
সংঘর্ষের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেন যে তাঁরা হা-মীম গ্রুপের শ্রমিকদের বের হওয়ার আহ্বান জানানোর সময় উপস্থিত প্রশাসনের লোকেরা তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং অনেক কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করায় অনেকেই আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানান যে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে সরকার ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর মতে পোশাক কারখানায় ভাঙচুর কিংবা অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাগুলো সন্দেহজনক এবং সাধারণ শ্রমিকেরা নিজেরা কারখানা ভাঙচুর করেন না বিধায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিল্প পুলিশ এবং ঢাকা জেলা পুলিশ যৌথভাবে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি উল্লেখ করেন যে শিল্প পুলিশ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং কারখানায় নাশকতা ও ভাঙচুর প্রতিরোধের জন্য সচেষ্ট রয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান যে নরসিংহপুর, বিশমাইল ও কাঠগড়া অঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় ইতিমধ্যেই ছুটি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই আন্দোলনে বহু বহিরাগত দুষ্কৃতকারী অংশ নিয়েছে বলে তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আটকের চেষ্টা চলছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর