নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাঙালি পাঠকের সামনে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি উপস্থাপিত হয়েছে মূলত এর বাংলা ভাষ্যের মাধ্যমে। প্রখ্যাত এই ডায়েরির মূল ইংরেজি রূপ থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অনুবাদ করেছেন কবি বেলাল চৌধুরী। মাঝে মাঝে তাঁর এই অনুবাদকর্মে স্বনামে যুক্ত হয়েছেন স্বয়ং লেখকের সুযোগ্য কন্যা সিমিন হোসেন রিমি। সার্বিকভাবে এই অনুবাদ অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও মূল ইংরেজি লেখার সঙ্গে মিলিয়ে অনুবাদের শতভাগ ন্যায্যতা যাচাই করার সুযোগ আমাদের হয়নি, তবুও সাবলীল বাংলা ভাষ্য পাঠ করলেই অনুবাদের চমৎকার প্রাঞ্জলতা এবং মূল রচনার প্রতি গভীর নিষ্ঠার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়।
এই অনুবাদের সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখেযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, লেখাটি যদি সরাসরি বাংলাতেই রচিত হতো তবে ঠিক যেমন ভঙ্গি ধারণ করত, অনুবাদে সেই নির্দিষ্ট গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত সফলভাবে বজায় রাখা হয়েছে। যতদূর তথ্য পাওয়া যায়, এখন পর্যন্ত এই ডায়েরিগুলোর পাঠক কিংবা বিশ্লেષক মহলে অনুবাদের যথাযথ মান নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। ফলস্বরূপ, আমাদের বর্তমান সামগ্রিক আলোচনায় আমরা সম্পূর্ণভাবেই এই বাংলা ভাষ্যের ওপর নির্ভর করে সামনে এগোব।
ডায়েরি পাতার ভেতরের পরিমিতিবোধ, অসাধারণ নিয়মানুবর্তিতা এবং পরম বস্তুনিষ্ঠতা যেকোনো সাধারণ বা অসাধারণ পাঠকের নজর কাড়তে বাধ্য। এর ভেতর আবেগ বা অনুভূতির প্রকাশ, কোনো ব্যক্তিগত মূল্যায়ন কিংবা অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকি পরম বন্ধু কিংবা একান্ত আপন পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার সময়ও লেখক কখনো অপ্রয়োজনীয় বা বাড়তি শব্দ ব্যয় করেননি। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫৪ সালের ৭ অক্টোবর তারিখের নির্দিষ্ট বিবরণীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাড়িতে মা ডোবা পিঠা বানাচ্ছিলেন। আমি রাত প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত সেখানে বসে থাকলাম।’ এই মাত্রার ব্যক্তিগত তথ্য ডায়েরিতে অত্যন্ত বিরল।
ডায়েরির এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে আমরা একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করতে আগ্রহী। মূলত অন্তত দুই গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে এটি আমাদের গবেষণায় কাজে লাগবে। একদিকে, লেখক নিজে ঠিক কোন বিষয়টিকে উল্লেখ করার মতো মনে করছেন এবং কোনটিকে করছেন না, তা গভীরভাবে লক্ষ করলে তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্বের একটা স্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, কোনো ধরনের সচেতন মন্তব্য বা মূল্যায়নহীন সাদামাটা বিবরণী লেখকমনের অচেতন জগৎকে যতটা নিগূঢ়ভাবে চিহ্নিত করতে পারে, তা সচেতন কোনো মন্তব্য বা বিশ্লেষণ থেকে কখনোই লাভ করা সম্ভব নয়।
বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রে এই ডায়েরির আরেকটি বাড়তি ও বড় সুবিধা হলো, এগুলো লেখা হয়েছিল এমন এক বয়সে, যখন এই লেখাগুলো একদিন প্রকাশিত হবে কিংবা কখনো গণপরিসরে ব্যবহৃত হবে—লেখকের নিজস্ব মানসিকতা থেকে এমন কোনো ভাবনার সম্ভাবনা দূরদূরান্তেও ছিল না। আমরা বর্তমান আলোচনায় যেভাবে ডায়েরিটি পাঠ করতে চাই, তার জন্য লেখকের এই বৈশিষ্ট্যটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের আলোচনার শিরোনামে ব্যবহৃত ‘ঐতিহাসিকতা’ শব্দটি মূলত ইতিহাসবিষয়ক নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের কতগুলো জটিল ও সংবেদনশীল প্রশ্নে একধরনের বিতর্কমূলক পরিসর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেই দিক থেকে বিচার করলে এই ধারণাটি সাধারণ ইতিহাসের তুলনায় অনেক বেশি বিমূর্ত এবং ইতিহাস-নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে কাজ করে। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিগুলো এই বিষয়ে আমাদের মূল্যবান উপকরণ হিসেবে নানাভাবে সাহায্য করে—এই নির্দিষ্ট অনুমানটিই এখানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
পাশাপাশি, ‘রাজনৈতিকতা’ কথাটিকে সাধারণ ‘রাজনীতি’ বা স্রেফ ‘রাজনীতি করা’র তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিসরের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য রাজনীতির মূল ভিত্তি অন্বেষণ করাই প্রধান কথা। এই অর্থে তাজউদ্দীন আহমদ নিজে সরাসরি যে রাজনীতি করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, তবে তাঁর কর্মতৎপরতা কিংবা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রাজনীতির যে সুনির্দিষ্ট বার্তা ঘোষিত হয়েছে, তা আরও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এই ডায়েরি থেকে কীভাবে ‘ঐতিহাসিকতা’ ও ‘রাজনৈতিকতা’ গভীরভাবে তালাশ করব, তার একটি চমৎকার নমুনা হিসেবে ডায়েরিতে নিয়মিত প্রাপ্ত আবহাওয়া-সংবাদগুলো পাঠ করা যেতে পারে। ডায়েরিজুড়ে অত্যন্ত ব্যতিক্রমহীনভাবে আবহাওয়ার নানা সংবাদ নিয়মিত লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি এই বিবরণীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় দিক।
তাজউদ্দীন আহমদ এখানে প্রধানত প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণের প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপের একদম প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টি, রোদ, তীব্র ঠান্ডা কিংবা চাঁদ ও সূর্যের সামগ্রিক অবস্থা এবং এর ফলে মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়ছে ইত্যাদি বিষয়। এসব বিবরণ পড়ে মাঝেমধ্যে হয়তো কোনো কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যে তিনি বুঝি প্রকৃতিকে কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর গণ্ডির মধ্যেই সীমিত করে ফেলেছেন।
আসলে কিন্তু তা নয়। তিনি মাঝেমধ্যেই নিছক বস্তু থেকে বেরিয়ে গভীর অনুভব-অনুভূতির জগতের দিকেও পা বাড়িয়েছেন। প্রকৃতির বিশেষ কোনো অবস্থায় বস্তু-অতিরিক্ত সৌন্দর্য কিংবা সুখানুভূতির যে গভীর দ্যোতনা যেভাবে মানুষের মনে ক্রিয়া করে, তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখও এই ডায়েরির পাতায় স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। বৃষ্টির প্রতি কিংবা শীতের ঋতুর প্রতি তাঁর মধ্যে কোনো বিশেষ বা অতিরিক্ত আকর্ষণ প্রকাশিত না হলেও রাতের অপরূপ সৌন্দর্য, বিশেষ করে চাঁদ কিংবা পূর্ণিমার প্রতি তাঁর মনোযোগের যথেষ্ট পরিচয় এখানে পাওয়া যায়।
মেঘের অস্বাভাবিক প্রতাপের কারণে আকাশে চাঁদের দেখা না পাওয়ায় তিনি বেশ অনেকবার মৃদু অনুযোগও প্রকাশ করেছেন। এর বাইরেও প্রকৃতির নানা উপাদান কিংবা তাদের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের ব্যাপারে তিনি মাঝেমধ্যেই এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা প্রকৃতির নিছক বস্তু-স্বভাবের গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৃতির প্রতি তাঁর নিজস্ব অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। তবে এই ধরনের উপাদান তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম, নিরেট ও বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনাই তিনি প্রধানত দিয়ে গেছেন।
বিগত বেশ কয়েকটি বছরের আবহাওয়ার এই বাস্তব পরিচয়ের পেছনে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন ঢাকার আবহাওয়া অফিস প্রকৃতির প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত কতটা সঠিকভাবে রক্ষা করত তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ বা সংশয় থাকার অবকাশ রয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের এই বিবরণী অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত কোনো কেতা বা নিয়ম রক্ষা করেছে, এমনটি ভাবারও কোনো কারণ নেই।
কিন্তু অন্তত বৃহত্তর ঢাকা জেলার আবহাওয়ার একটি সাধারণ বিবরণী এই ডায়েরিমালায় যেভাবে পরম যত্নে সংরক্ষিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের জন্য অত্যন্ত দুর্লভ ও মূল্যবান প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি তিনি আবহাওয়া কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে নিজের নিভৃত সম্পর্ক কিংবা এ বিষয়ে নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির বিবরণকেই একমাত্র প্রাধান্য দিতেন, তাহলে এই কথাটি এতটা জোরালোভাবে নিশ্চিত করে বলা কখনোই সম্ভব হতো না।
শিরোনামে ব্যবহৃত ‘ঐতিহাসিকতা’ শব্দটির মাধ্যমে মূলত ইতিহাসবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের বেশ কিছু জটিল প্রশ্নে একধরনের বিতর্কমূলক পরিসরকে বোঝানো হয়েছে। সেই বিচারে এই ধারণাটি সাধারণ ইতিহাসের তুলনায় অনেক বেশি বিমূর্ত এবং ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণকারী। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে ঠিক এই জায়গায় আমাদের সাহায্য করে—এই নির্দিষ্ট অনুমানটিই আমাদের গোটা আলোচনার মূল ভিত্তি।
তবে এই ডায়েরিগুলোর অন্তর্নিহিত বিশিষ্টতা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমাদের কাঙ্ক্ষিত পাঠ-ফলের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আবহাওয়া-সংক্রান্ত এই বিবরণীগুলো অন্য আরও দুটি বিশেষ দিক থেকে গভীরভাবে পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
এর মধ্যে প্রথম বিষয়টি হলো, প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গে মানুষের প্রাত্যহিক আরাম ও ব্যারামের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এই ডায়েরিগুলো যখন নিয়মিত লেখা হচ্ছিল, তখন তৎকালীন নাগরিক পরিসরেও প্রকৃতির যেকোনো স্বাভাবিক অবস্থাকে কৃত্রিম উপায়ে রদ করার বা নিজেদের অনুকূলে রূপান্তর করার সক্ষমতা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে ছিল।
সে সময় বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহারও নিশ্চিতভাবেই ছিল খুবই সীমিত। এমতাবস্থায় তীব্র গরম কিংবা কনকনে শীত সাধারণ মানুষকে আজকের তুলনায় অনেক বেশি গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারত। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আকাশে ঘন মেঘ জমেছে অথচ বাতাসের কোনো প্রবাহ নেই, এই রকম একটি গুমোট রাতে আবহাওয়া সরাসরি মানুষের ঘুমের গভীরতা বা মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করত।
শহরের উন্নত যানবাহন কিংবা আকস্মিক বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার আধুনিক বা বিকল্প উপায়গুলো সে যুগে তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকায় বৃষ্টি মানুষের প্রাত্যহিক গতিবিধিকে অনেক বেশি মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। তা ছাড়া তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগবালাইয়ের ভয়ংকর প্রাদুর্ভাব ও ভোগান্তির বিষয়টি তো সবসময়ই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর