নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বর্ষাকালীন পরিস্থিতি, বিভিন্ন এলাকার বন্যা এবং মাটির সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার সুযোগ বৃদ্ধি পেলে মানবদেহে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে এই রোগটির প্রকৃত ব্যাপকতা ও প্রকোপ দীর্ঘকাল ধরেই কম অনুমান করা হয়ে আসছে, যার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং এই নির্দিষ্ট রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসকদের জ্ঞানের ঘাটতি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো এই ক্ষতিকর জীবাণু প্রকৃতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকতে সক্ষম এবং দূষিত মাটি অথবা পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে সহজেই বাসা বাঁধতে পারে। এছাড়া জীবাণুটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং এর যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে, যেখানে গুরুতর সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে এবং সুস্থ হওয়ার পরেও রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
আমাদের দেশ বাংলাদেশেও ইতিপূর্বে মেলিওডোসিসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক দলিল বা প্রতিবেদন রয়েছে। এ দেশের মাটি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিকাজের প্রকৃতি এবং বর্ষাকালে পানির সংস্পর্শে আসার বিভিন্ন বিষয়গুলো এই রোগের সামগ্রিক ঝুঁকি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর অবিকল কতজন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রকৃত সংক্রমণের হার ঠিক কত এবং সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুর জাতীয় হার কেমন; সেই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এই রোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা বা চ্যালেঞ্জ হলো এ সম্পর্কে মানুষের সীমিত সচেতনতা এবং এর লক্ষণগুলোর সঙ্গে অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণের লক্ষণের মিল থাকা। দীর্ঘমেয়াদী জ্বর, নিউমোনিয়া কিংবা সেপসিসে আক্রান্ত কোনো রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসায় যদি কাঙ্ক্ষিত উন্নতি লক্ষ্য করা না যায় এবং তার যদি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পরিবেশের সংস্পর্শে যাওয়ার ইতিহাস থাকে, তবে চিকিৎসকদের অবশ্যই মেলিওডোসিসের সম্ভাবনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সাধারণত এই জীবাণু সংক্রমিত কোনো মানুষ থেকে সুস্থ মানুষের শরীরে খুব সহজে ছড়ায় না এবং মানুষ প্রধানত পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই সরাসরি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই মারাত্মক রোগটি মূলত তিনটি ভিন্ন উপায়ে সংক্রমিত হতে পারে যা সম্পর্কে সকলের সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।
প্রথমত ত্বকের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে, যেখানে দূষিত মাটি কিংবা পানির সংস্পর্শে এসে শরীরের কোনো ক্ষতস্থানের সাহায্যে জীবাণু খুব সহজেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। দ্বিতীয়ত দূষিত পানি বা মাটি থেকেও এটি ছড়াতে পারে, যার মধ্যে সংক্রমিত পানি পান করা কিংবা দূষিত পানি ও মাটির সংস্পর্শে আসা অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত শ্বাসের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে, যেখানে দূষিত ধুলাবালি বা পানির অতি ক্ষুদ্র কণা বিশেষ করে কালবৈশাখী ঝড়, বন্যা কিংবা ভারী বৃষ্টির সময়ে মানুষের শ্বাসের সঙ্গে সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগটি হলো মেলিওডোসিসের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঝুঁকির কারণ। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, দীর্ঘকাল ধরে ভোগা ফুসফুসের রোগ, অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যালকোহল পান করার অভ্যাস, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মাটির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার ফলেও এই রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে কৃষক, খেতমজুর, নির্মাণে নিয়োজিত শ্রমিক এবং বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা জরুরি, যদিও যেকোনো সুস্থ মানুষও এই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
পরিবেশের এই জীবাণুর সংস্পর্শে আসার সাধারণত এক থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে শরীরে নানা লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে, যদিও ক্ষেত্রবিশেষে এই সময়ের তারতম্য ঘটে থাকে। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র বা দীর্ঘমেয়াদী জ্বর এবং কাঁপুনি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও নিউমোনিয়া, ত্বকে ফোড়া তৈরি হওয়া, ঘা বা পুঁজ জমা, হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা বা সংক্রমণ, এবং যকৃৎ, প্লীহা কিংবা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে পুঁজ জমা হওয়া। অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতিতে রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে, রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে এবং শরীরের একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে বিকল হয়ে যেতে পারে।
কখনো কখনো এই রোগের লক্ষণগুলো যক্ষ্মা বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের মতোই প্রতিভাত হতে পারে, যার ফলে শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে রোগটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। মেলিওডোসিসের সবচেয়ে ভীতিপ্রদ দিক হলো এর গুরুতর সংক্রমণে সৃষ্ট অবধারিত মৃত্যুঝুঁকি। বিভিন্ন দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণায়, বিশেষ করে সেপসিসের রোগীদের ক্ষেত্রে, মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। যথাযথ চিকিৎসা এবং নিবিড় পরিচর্যার সব ধরনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, এমনকি কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এর চেয়েও বেশি হতে দেখা যায়। বাংলাদেশে ১৯৬১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শনাক্ত হওয়া মোট ৫১ জন রোগীর মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা ছিল প্রায় ২৭ শতাংশের মতো।
মেলিওডোসিসের চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ধরে সুনির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে এবং সাধারণত এর চিকিৎসাপদ্ধতি দুটি ভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে থাকে। চিকিৎসার প্রথম পর্যায়ে গুরুতর সংক্রমণের জন্য রোগীকে সরাসরি শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন প্রদান করা হয়। রোগের তীব্রতা এবং শরীরের কোন কোন অঙ্গ আক্রান্ত হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার এই প্রথম পর্যায়টি কয়েক সপ্তাহ কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে রোগটি যেন পুনরায় ফিরে না আসে বা নতুন করে সংক্রমণ না ঘটে, সেটির ঝুঁকি কমাতে সাধারণত দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে দেওয়া হয়। রোগের প্রকৃত ধরন, অ্যান্টিবায়োটিকের সংবেদনশীলতা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করেই মূলত সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারিত হয়।
সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে রক্ত, পুঁজ, কফ কিংবা আক্রান্ত নির্দিষ্ট অঙ্গের যথাযথ নমুনার কালচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো ধরনের সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসক ও মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগারকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো অত্যন্ত জরুরি, যাতে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপদ উপায়ে নমুনা ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুততম সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। মেলিওডোসিস রোগ প্রতিরোধ করার মতো এখনো পর্যন্ত কোনো বহুল ব্যবহৃত ও অনুমোদিত টিকা আবিষ্কার হয়নি, তাই পারিপার্শ্বিক পরিবেশগত সংস্পর্শ যথাসম্ভব কমিয়ে আনাই হলো এটি প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
বাংলাদেশে মেলিওডোসিসের প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যুর সামগ্রিক বোঝা এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৩ সালের একটি গবেষণা-প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পর মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে নতুন ৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এই ঘটনাটি রোগের প্রকৃত বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে গবেষণা করা, উন্নত মানের পরীক্ষাগার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চিকিৎসকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর