ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তিব্বতে ৭ মাত্রার ভূকম্পনে ১৬ জনের প্রাণহানি, তাইওয়ানে টাইফুন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
তিব্বতে ৭ মাত্রার ভূকম্পনে ১৬ জনের প্রাণহানি, তাইওয়ানে টাইফুন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

চীনের দুর্গম তিব্বত অঞ্চলে আঘাত হানা ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূকম্পনে কমপক্ষে ষোলো জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ছিয়াচল্লিশ জন। অপরদিকে দেশটির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তাইওয়ানের দিকে প্রবল বেগে এগিয়ে চলা সুপার টাইফুন ‘চ্যাম্পি’র কারণে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন চুরানব্বই জন। আঞ্চলিক প্রশাসন সূত্রে সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাত ঠিক দশটা বেজে তেত্রিশ মিনিটে এই ভূকম্পনটি সংঘটিত হয়। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে তিন শতাধিক বসতবাড়ি হয় সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে নতুবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে দুর্গত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি জোরেশোরে উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশন স্টেশন সিসিটিভি প্রকাশ করেছে যে, জখম হওয়া মানুষদের মধ্য থেকে এগারোজন নাগরিকের শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ভূমিষ্ঠ এই কম্পনের ফলে মোট তিনশো উনচল্লিশটি ভবন বিধ্বস্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজছেন। একাধিক ভবনের ছাদ অংশবিশেষ ভেঙে পড়েছে এবং একজন ক্ষতিগ্রস্তকে পজিশনে সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যও নজরে এসেছে। এছাড়া অন্য ভবনগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা টর্চের আলো ফেলে তল্লাশি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

সিসিটিভির সম্প্রচারিত দৃশ্যে ফুটে উঠেছে যে, ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার মুহূর্তেই একটি রেস্তোরাঁ থেকে কর্মীরা দ্রুত ছুটে বাইরে চলে আসেন। একটি বিপণিবিতানের বিভিন্ন পণ্যভরা তাক থেকে দ্রব্যাদি হুড়মুড় করে মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, পাহাড়ি ভূমিরূপ বিশিষ্ট ওই ভূকম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল মাটির প্রায় দশ কিলোমিটার গভীরতায়। কেন্দ্রস্থলটি নাগচু শহরের আনুমানিক একশো নব্বই কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে এবং তিব্বতের প্রধান শহর লাসা থেকে তিনশো নব্বই কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ছিল।

ভূকম্পন সংঘটিত হওয়ার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সিসিটিভির সংবাদে জানানো হয়। কম্পনের উৎপত্তিস্থল বাকেন কাউন্টির মারু টাউনশিপের উপপ্রধান লাওয়াং দাগপো গণমাধ্যমকে জানান যে, তাদের কার্যালয় ভবনেও কম্পন বেশ জোরালোভাবেই অনুভূত হয়েছে। এই আকস্মিক ঘটনার জেরে ওই কার্যালয়ের দেওয়ালগুলোতে দৃশ্যমান ফাটল ধরেছে। সিনহুয়ার তথ্যানুযায়ী, এই ভূকম্পনের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট কাউন্টির প্রশাসনিক কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণের কাজে সর্বাত্মক সহায়তার জন্য তিনশতের বেশি পুলিশ সদস্যকে ইতোমধ্যে ওই এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার দপ্তরের তিনশো সাতচল্লিশ জন কর্মীকেও দুর্গত জনপদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজকের দিনে এসে তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রান্ত থেকে প্রায় তিনশো কুড়ি কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছে এই ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টি। দ্বীপটিতে সরাসরি আঘাত হানার প্রবল ঝুঁকির কারণে ভারী বর্ষণ ও তীব্র বেগের বাতাসের সতর্কবার্তার মুখে পড়ে গোটা তাইওয়ান প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে মোট নয়শো একান্নটি বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে।

পূর্বে প্রচারিত সিসিটিভির ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনায় তদারকি ও তল্লাশি চালাচ্ছেন। কয়েকটি বাড়ির ছাদ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং একজন আহত ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সেখানে ধারণ করা হয়েছে। অন্য ভবনগুলোর অন্ধকার ঘরে উদ্ধারকর্মীরা টর্চের আলো জ্বেলে জীবিত কাউকে পাওয়া যায় কি না তা খুঁজছেন। অন্যদিকে সরকারি নির্দেশনার অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

চীনে প্রায় নিয়মিত ঘটনাই হলো ছোট-বড় বিভিন্নমাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়া। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিব্বতেরই দূরবর্তী তিংরি কাউন্টিতে আরেকটি ভূমিকম্পের ফলে অন্তত একশো ছাব্বিশ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তারও পূর্বে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের জনবিরল অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে প্রায় একশো সাতাশ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল বলে রাষ্ট্রীয় মাধ্যম জানিয়েছিল। ২০১৪ সালের পর সেটিই ছিল চীনের ভূখণ্ডে ঘটা সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী কোনো ভূকম্পন। ওই একই বছরে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশে হওয়া ভূমিকম্পে ছয়শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল।

তদুপরি ২০০৮ সালের সিচুয়ান প্রদেশের ভয়ংকর ভূমিকম্পে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ হয় মারা যান কিংবা চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। সেই নিখোঁজ বা মৃতদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার সংখ্যক কোমলমতি স্কুলশিক্ষার্থীও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ অঞ্চল তাইওয়ানের অভিমুখে ধেয়ে চলা শক্তিশালী টাইফুন ‘চ্যাম্পি’র আঘাতে ইতিমধ্যে একজন নিহত এবং চুরানব্বই জন আহত হয়েছেন। এই অতি শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ রেকর্ড করা হয়েছে ঘণ্টায় একশো একান্ন কিলোমিটার। পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ থেকে প্রায় এক হাজার তিনশো জন বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

চলতি শুক্রবার তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় তিনশো কুড়ি কিলোমিটার পূর্বে নিজস্ব অবস্থান বজায় রেখেছিল এই কালবৈশাখী ঝড়টি। সরাসরি আঘাত হানার তীব্র আশঙ্কায় ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কবার্তার প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের স্বাভাবিক জনজীবন প্রায় অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। বিমান চলাচলের পাশাপাশি তাইওয়ানের আর্থিক বাজারের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সুপার টাইফুনে রূপ নেওয়া ‘চ্যাম্পি’ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চলতি বছরে জন্ম নেওয়া অন্যতম শক্তিশালী একটি ঝড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন জানিয়েছে যে, এই ঝড়টির বাতাসের বিস্তার রয়েছে প্রায় তিনশো কুড়ি কিলোমিটার পর্যন্ত।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, চ্যাম্পি ঝড়টি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের পাশ ঘেঁষে উত্তর দিকে চীনের মূল ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হতে পারে। পরবর্তীতে এটি দক্ষিণ জাপানের দিকেও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন। তবে ঝড়ের মূল গতিপ্রকৃতিতে সামান্য পরিবর্তন ঘটলে এটি সরাসরি তাইওয়ানে আঘাত হানার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সম্ভাব্য দুর্যোগের সতর্কতার অংশ হিসেবে আজ তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রুটের দুইশো বাষ্পান্নটি এবং আন্তর্জাতিক রুটের ছয়শো উনসত্তরটি ফ্লাইট পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। তবে দ্বীপটির উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত চলাচলকারী উচ্চগতির ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।

উপকূলীয় এলাকার শহরগুলোতে বসবাসকারী নাগরিকদের মুঠোফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে স্থানীয় সরকারি প্রশাসন। সেখানে ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটারের চেয়েও বেশি গতিবেগের বাতাসের ঝাপটা আসার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, চ্যাম্পি নামক এই ঝড়ের তাণ্ডবের প্রভাব প্রায় দুই দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাইওয়ান সাধারণত প্রবল টাইফুন মোকাবিলায় সবসময়ই বেশ ভালো রকমের প্রশাসনিক প্রস্তুতি বজায় রাখে। সেই কারণে এজাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সেখানে অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রাণহানির পরিমাণ সাধারণত কিছুটা কম হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালের পাশাপাশি শরতের এই সময়েও মাঝেমধ্যে এমন বিধ্বংসী ঝড়ের কবলে পড়তে হয় এই অঞ্চলকে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
গত ১৭ বছর ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভুল ও ম

গত ১৭ বছর ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভুল ও ম