নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৯৯৮ সালের শেষভাগে নিজ আবাসস্থল ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এই অভিযাত্রী। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল পদব্রজে সম্পূর্ণ পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা। অবশেষে সুদীর্ঘ আটাশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সেই অভিযাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে। নিজ জননীর বাসভবনের প্রবেশদ্বারে পা রেখে নিজের এই সুদীর্ঘ পথচলার ইতি টানলেন কার্ল বুশবি।
এই প্রলম্বিত পর্যটনকালে তিনি সবমিলিয়ে প্রায় একত্রিশ হাজার মাইল পথ হেঁটে অতিক্রম করেছেন। এ সময়ে তিনি মোট চারটি মহাদেশ ঘুরে দেখেছেন। মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে অন্য কোনো অভিযাত্রী এমন অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব কীর্তি স্থাপন করতে পারেননি।
গত ২০২৬ সালের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ সোমবার ইংল্যান্ডের পূর্ব তীরের বন্দরসংলগ্ন শহর হালে এসে উপস্থিত হন ছাপ্পান্ন বছর বয়স্ক কার্ল। ওই শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচুর জনতা সমবেত হয়েছিল। সেখান থেকে পদব্রজে শেষ কয়েকটি মাইল অতিক্রম করে তিনি অবশেষে তাঁর মায়ের বাসগৃহে উপস্থিত হন।
জননী অ্যাঞ্জেলা বুশবি তাঁর সন্তানকে ঘরে ফিরিয়ে আনার প্রতীক্ষায় নিজ বাসভবনের প্রাঙ্গণে ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা এবং ‘স্বাগতম ঘরে’ লেখা একটি ফেস্টুন সাজিয়ে রেখেছিলেন। সুদীর্ঘ আটাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার সেই মুহূর্তটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।
এই বিশ্বভ্রমণের সূচনা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের চিলি রাষ্ট্রের পুন্তা আরেনাস নামক জনপদ থেকে। সেখান থেকে উত্তর দিক বরাবর পদচারণ করতে করতে তিনি একসময় বেরিং প্রণালীর সান্নিধ্যে উপনীত হন। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালের মার্চ মাসে তিনি পদব্রজে সম্পূর্ণ ওই প্রণালী পার হয়ে যান।
বেরিং প্রণালী পার হওয়ার পর এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করে তিনি ক্রমান্বয়ে যুক্তরাজ্যের পানে অগ্রসর হতে থাকেন। এই সুবিশাল অভিযাত্রার পথপরিক্রমায় তাঁকে পৃথিবীর বহু নিকৃষ্টতম ও অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়েছে।
পথিমধ্যে তাঁকে দারিয়েন গ্যাপের ন্যায় অত্যন্ত দুর্গম অরণ্যভূমি অতিক্রম করতে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভ্রমণের সময় তাঁকে একাধিকবার আটক করা হয়েছে, নির্দিষ্ট রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, এমনকি তিনি ভুলবশত পথও হারিয়ে ফেলেছেন। তা সত্ত্বেও কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাঁর অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করতে পারেনি।
এই অভিযাত্রার প্রারম্ভেই কার্ল নিজের জন্য কয়েকটি কঠোর অনুশাসন নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি বিশেষ শর্ত ছিল যে, গোটা অভিযাত্রা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ভূখণ্ডের মাটিতে কোনোভাবেই পদার্পণ করবেন না।
এই কঠোর নিয়মের কারণে জন্মদাতা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও তাঁর পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর ঔরসে জন্ম নেওয়া একটি পুত্রসন্তান রয়েছে, এবং সেই পুত্রের ঘরে আবার বারো বছর বয়সি একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। সোমবার হাল শহরে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে ওই নাতনির সঙ্গে তাঁর মোটেও দেখা হয়নি।
তাঁর অপর আরেকটি শর্ত ছিল এই যে, ভ্রমণের কোনো স্তরেই মোটরগাড়ি, জলযান কিংবা বিমানজাতীয় কোনো যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার করা যাবে না। ফলস্বরূপ, ইউরোপ মহাদেশ পার হয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে তাঁকে প্রমত্ত ইংলিশ চ্যানেলও সাঁতরে পার হতে হয়েছে। গত ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সেই অত্যন্ত দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেন।
এই সামগ্রিক অভিযানে কার্লের নিত্যসঙ্গী হিসেবে ছিল বিশেষভাবে রূপান্তরিত একটি গলফ ট্রলি। ওই ট্রলির ভেতরে তিনি তাঁবু টানার সামগ্রী, পরিধেয় বস্ত্র, প্রসাধন সামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য এবং পানীয় জল সযত্নে বহন করতেন। সুদীর্ঘ পথের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তিনি এই ট্রলির মাধ্যমেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছেন।
কার্লের নিজ আবাসে প্রত্যাবর্তনের ওই দিনটিতে হাল শহরে উপস্থিত ছিলেন জার্মানির খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়ার্নার হারৎসগ। কার্ল ইন্টারনেটের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ইতিপূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করবেন এই বিশিষ্ট নির্মাতা। সোমবার আয়োজিত এক সাংবাদ সম্মেলনে কার্ল গণমাধ্যমকে জানান যে, আগামী বারো মাস সময় জুড়ে তিনি এই প্রামাণ্যচিত্র এবং নিজের রচিত একটি গ্রন্থ নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করবেন।
তবে এত দীর্ঘ পথ হেঁটে ঘরে ফেরার মানসিক অনুভূতি কোনোভাবেই সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কার্ল মন্তব্য করেন, আজকের এই দিনটি ঠিক কেমন অনুভূত হলো, তা কাউকে সঠিকভাবে বুঝিয়ে বলা অত্যন্ত দুরূহ। সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ এখনও আমার স্মৃতিপটে একটি বিশাল ও অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতির মতো প্রতিভাত হচ্ছে।
পরিশেষে আটাশ বছরের প্রলম্বিত পদযাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটেছে জননীর কোলঘেঁষে। পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার মতো এমন এক মহাকাব্যিক ও দীর্ঘায়িত অভিযানের অন্তিম গন্তব্য নিজ মায়ের বাড়ি হওয়ায় কার্ল বুশবির এই রোমাঞ্চকর কাহিনীটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর