ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গুতে তরুণের মৃত্যু, শোকে পাথর বইপ্রেমী অরূপের বাবা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
ডেঙ্গুতে তরুণের মৃত্যু, শোকে পাথর বইপ্রেমী অরূপের বাবা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

শেষকৃত্যের আয়োজনে যখন চারদিক ব্যস্ত, তখনো নিস্তব্ধ ঘরে বসে নীরবে চোখের জল ফেলୁছেন শোকার্ত অর্জুন বণিক। প্রিয় সন্তানের বিষয়ে কোনো কিছু জানতে চাওয়ামাত্রই তাঁর বুকভাঙ্গা কান্না গড়িয়ে পড়ে। বাইশ বছর বয়সী অরূপ বণিককে এভাবে হঠাৎ চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হবে, এমন দুঃস্বপ্ন তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি।

চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদিফকিরহাট এলাকায় তাঁদের বসবাস। একটানা সাত দিন তীব্র জ্বরে আক্রান্ত থাকার পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে অরূপের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। পরিজনদের জোরালো দাবি, মরণব্যাধি ডেঙ্গু জ্বরই তাঁর অকাল মৃত্যুর কারণ। অসুস্থ শরীর নিয়ে রাজধানী থেকে ওই দিন বিকেলে নিজগৃহে পৌঁছানোর মাত্র ষাট মিনিটের মধ্যে তাঁর মৃত্যু ঘটে। ওই দিন রাতেই স্থানীয় শ্মশানে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর সৎকার সম্পন্ন হয়।

সাহিত্যপ্রেমী অরূপ ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। পাশাপাশি চারপাশেই বই পড়ার অভ্যাস ছড়িয়ে দেওয়া ছিল তাঁর অন্যতম ব্রত। বইয়ের প্রতি অগাধ টানের কারণেই মহামারী করোনার সময়ে দুজন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বই ব্যবসার একটি মাধ্যম ‘বইপাড়া ডটকম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় নিজস্ব একটি বইয়ের দোকানও চালু করেন তিনি। পুরোনো ঢাকার একটি মেস বাড়িতে অবস্থান করে সেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

শোকার্ত পিতা অর্জুন বণিক জানান, ঘটনার প্রায় পাক্ষিক কাল আগে তাঁদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থ স্বজনদের দেখভাল করার জন্য সে সময় রাজধানী থেকে ছুটে এসেছিলেন অরূপ। বাকিরা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি কর্মস্থলে ফিরে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকেও ঘিরে ধরে উচ্চ তাপমাত্রা। শারীরিক ব্যথা অনুভব হওয়াসহ ডেঙ্গুর যাবতীয় উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর শরীরে।

অর্জুন বণিক আরও জানান, সন্তানকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছিল দ্রুত যেন ফিরে আসে। কিন্তু সে বাবার কথা রাখেনি। শেষপর্যন্ত আর পেরে না উঠে বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে গ্রামে পৌঁছায়। যানবাহন থেকে নামার পর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসেন। ঘরের ভেতর প্রবেশ করার মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি দেখা দেয়। দ্রুত স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান যে অরূপ আর বেঁচে নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি উল্লেখ করেন, সবার সঙ্গে শেষ দেখা করতেই সে বাড়ি এসেছিল এবং ডেঙ্গু তাঁর সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে।

তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার কনিষ্ঠ ছিলেন অরূপ। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁদের বাসগৃহে গিয়ে দেখা যায়, নিথর দেহের পাশে বসে বিলাপ করছেন দুই বোন। সেখানে উপস্থিত হয়েছেন তাঁর বন্ধুরাও। কেউ উচ্চস্বরে কাঁদছেন, আবার কেউ পুরোনো স্মৃতিচারণায় মগ্ন রয়েছেন।

সহপাঠী ও আত্মীয়স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারহাট এনআর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন অরূপ। পরবর্তীতে ফেনীর জয়নাল হাজারী কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

মহামারীর বছর ২০২০ সালে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া এলাকায় সহযোদ্ধা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও অনিক বণিককে নিয়ে অনলাইনভিত্তিক বইয়ের প্ল্যাটফর্মটি চালু করেছিলেন। শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন প্রান্তের পাঠকদের কাছ থেকে দারুণ প্রশংসা ও ইতিবাচক সাড়া লাভ করেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ফেনী ছেড়ে কিছুদিন বন্দরনগরীতে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যদিও সেই পর্যায়ে বাকি দুই সহযোদ্ধা ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন, তবুও অরূপ একা হাতে উদ্যোগটি টিকিয়ে রেখেছিলেন। ইন্টারনেটের পাশাপাশি চলতি বছরে রাজধানীর বাংলাবাজারে একটি দোকান দেন। পুরোনো ঢাকার মেসে থেকে দেশি ও বিদেশি নানা ধরনের বই বিক্রি করতেন তিনি।

অরূপের বাড়িতে কথা হয় শৈশবের বন্ধু মো. মোস্তফার সঙ্গে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কাজে সোচ্চার ছিলেন অরূপ। মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসতেন। বই পড়ার মাধ্যমেই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব—এই বিশ্বাস থেকে তিনি বই বিস্তারের কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।

মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ফেনী থেকে ছুটে আসেন সহযোদ্ধা ও সহ-উদ্যোক্তা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। শ্মশানে শেষ বিদায়ের আগে মরদেহের ওপর ঝুঁকে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, নানা প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকট সত্ত্বেও অরূপ কখনো বইয়ের কাজ থামাননি এবং একেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বন্ধুর এই প্রস্থান তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
যশোরে সহস্রাধিক গাছ কাটার উদ্যোগ, পরিবেশ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

যশোরে সহস্রাধিক গাছ কাটার উদ্যোগ, পরিবেশ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা