নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সাত নভেম্বরের পটপরিবর্তন ও এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে এখনো প্রবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিতর্ক চলমান রয়েছে। বিএনপি এবং তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে 'জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবস' হিসেবে উদ্যাপন করে থাকে। দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে, এটি মূলত দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করার একটি ঐতিহাসিক দিন।
এর বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র জোট দিনটিকে 'মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস' হিসেবে স্মরণ করে থাকে। তাদের মূল যুক্তি হলো, ওই অভ্যুত্থানের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার, কর্নেল তাহের ও খন্দকার নাজমুল হুদার মতো প্রথিতযশা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পাশাপাশি, এই ঘটনার মাধ্যমেই দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসনের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল বলে তারা মনে করে।
অন্যদিকে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ দিনটিকে 'সিপাই-জনতার অভ্যুত্থান দিবস' হিসেবে পালন করে আসছে। তাদের এমন নামকরণের পেছনের কারণ হলো, দলটির নিজস্ব অঙ্গসংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা' সেই সময়কার সশস্ত্র বিদ্রোহের পেছনে প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল।
তবে একটানা প্রায় দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই বিশেষ দিনটিকে একটিমাত্র দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা করার যে প্রবণতা ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা পুনরায় নতুনভাবে যাচাই ও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে সাত নভেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো, যখনই দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যকারিতায় ব্যর্থ হয়, কেবল তখনই জনগণের সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিগুলোর পারস্পরিক সংহতিই দেশকে গভীর বিপদ থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাত নভেম্বর মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান ও শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। যখন নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের জালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এই দিনের আন্দোলন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, এই জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকার কোনোভাবেই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব নয়।
যদিও নানাবিধ ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কারণে এই দিবসটি নিয়ে সমাজে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে, তবুও দিনটি যে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিরাট টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা ছিল, সেই ধ্রুব সত্যকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা বা অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে এবং তার ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও সার্বিক সার্বভৌমত্বকে সর্বদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে যেকোনো ধরনের ক্ষুদ্র ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে অবস্থান করে জাতীয় সংহতি গড়ে তোলাকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে গণ্য করতে হবে। ইতিহাস নিজেই এর সাক্ষ্য বহন করে যে, যেকোনো জটিল ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন কিংবা গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়ে পারস্পরিক বিভাজন কোনো সমাধান নয়, বরং কেবল ঐক্যই একটি জাতির টিকে থাকার একমাত্র পথ।
জাতীয় সংহতি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি জাতি যখন চরম হতাশা ও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে, তখন সেখানে কোনো অলৌকিক বা জাদুকরি ফর্মুলা কাজ করে না; বরং দেশের আপামর জনসাধারণের সম্মিলিত ঐক্যের আলোই কেবল ওই জাতিকে একটি নতুন ভোরের আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সাত নভেম্বর হলো ঠিক তেমনি একটি ভোরের আলোকরেখা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এ দেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা, জাতীয় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রচেতনার সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণই মূলত যেকোনো দেশের ইতিহাসের আসল গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। পরিশেষে বলা যায়, সাত নভেম্বর কোনো নির্দিষ্ট একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, এটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের সংহতির ভেতরে সুপ্ত থাকা অদম্য শক্তির একটি শাশ্বত স্মারক মাত্র।
বিশ্লেষণটি প্রদান করেছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেক উদ্দিন।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর