নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গত এক যুগ ধরে চলা নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো, সংবিধানের বিভিন্ন স্তম্ভ এবং গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অত্যন্ত ভয়াবহ ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। আগামী দিনে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও দেশের গণতন্ত্রের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পুনর্বহাল করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
দেশের সাধারণ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে তাদের ধৈর্য হারাচ্ছেন এবং সরকারের ওপর ক্রমশ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে নিজেকে একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে অভিহিত করে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে, ভারতীয় জনগণ খুব দ্রুতই দেশের প্রকৃত শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়াকে আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানাবেন।
আসন্ন ১০ নভেম্বর সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে। এই বিশেষ বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’তে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। মূলত সেই সাক্ষাতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন নীতি এবং সরকারের সামগ্রিক কর্মপদ্ধতির কড়া সমালোচনা করে তিনি এই সমস্ত মন্তব্য করেন।
উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৭৫ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির প্রসঙ্গটি নিয়েও মুখ খুলেছেন এবং সেই ঘটনাটির জন্য একা সঞ্জয় গান্ধীকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করার তীব্র সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেছেন যে, সেই সময় রাজীব গান্ধীর মতো হাতে গোনা কিছু মানুষ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং নানা বিষয়ে মাকে সতর্ক করার চেষ্টা চালালেও সেই সতর্কবার্তাগুলোর প্রতি কর্ণপাত করা হয়নি।
রাজনীতির ময়দানে অনেক সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আপস করতে হলেও ভারতীয় জনতা পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে কংগ্রেস দল কখনোই কোনো আপস করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন।
২০২৯ সালের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান শাসকদল বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলে দেশের রাজনীতিতে কি আবার নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচিভিত্তিক লড়াইয়ের যুগ ফিরে আসবে কি না, সেই বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর প্রত্যুত্তরে সোনিয়া বিগত বারো বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাপক ক্ষতির কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে তিনি কোনোভাবেই হতাশ নন, তবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রচুর মেহনতের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনের উত্থান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কংগ্রেস নেত্রী উল্লেখ করেন যে, সমাজের বঞ্চিত এবং অনগ্রসর স্তর থেকেই বিজেপি ও আরএসএসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার উচ্চাসনে পৌঁছেছেন তিনি। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ধারা থেকে তাঁর এই সুদীর্ঘ পথচলা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তি নানাভাবে সাফল্য অর্জন করে থাকেন এবং কংগ্রেস দলের ভেতরেও মনমোহন সিং কিংবা মল্লিকার্জুন খাড়গের মতো তার বহু উজ্জ্বল নিদর্শন রয়েছে বলে আলোচনা ওঠে। এই প্রসঙ্গে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি স্পষ্ট সুরে জানান যে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কাছ থেকে তাঁদের দলের নতুন করে শেখার মতো কিছুই নেই বলে তিনি মনে করেন।
জরুরি অবস্থা জারির প্রকৃত পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান যে, সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছিল এবং সর্বত্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হচ্ছিল। সরকারি বিভিন্ন কার্যালয় ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটছিল এবং প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ অমান্য করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছিল, যার ফলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।
তিনি আরও যোগ করেন যে, জনগণের মনের মধ্যে জরুরি অবস্থা এবং সঞ্জয় গান্ধী যেন একাকার হয়ে সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল, কিন্তু কেবল সঞ্জয়কে এককভাবে সমস্ত দোষের ভাগী করা কোনোভাবেই সঠিক হবে না। সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর দলের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার তরফ থেকে তীব্র রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী নিজে সামগ্রিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তা প্রতিকার করার জন্য যথেষ্ট সচেষ্টও হয়েছিলেন বলে তিনি জানান। এছাড়া তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইন্দিরা গান্ধী নিজে থেকেই ১৯৭৭ সালে নতুন নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে জরুরি অবস্থা জারির জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
নিজের আত্মকথার বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গিয়ে তিনি তাঁর বিদেশি জন্মপরিচয়কে কেন্দ্র করে অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনারও অবতারণা করেছেন। শারদ পাওয়ার, পি এ সাংমা এবং তারিক আনোয়ারের মতো প্রবীণ নেতারা তাঁর বিদেশি পরিচয়কে সামনে এনে তিনি যাতে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ গ্রহণ না করেন, তার বিরুদ্ধে জোরালো মত প্রকাশ করেছিলেন বলে জানান।
সহকর্মীদের কাছ থেকে এমন আচরণ পাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত ব্যথিত ও কষ্ট পেয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন। যাঁদের তিনি দলের একান্ত বিশ্বস্ত সহকর্মী বলে মনে করতেন, তাঁরাই তাঁকে বিশ্বাস করতে পারেননি এবং বহিরাগত হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই এক বিশাল আঘাতের মতো ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বহু বছর পার হওয়ার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন যে সেই সময় সেই নেতাদেরও নিজস্ব কিছু যুক্তি ছিল এবং তা ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একেবারেই প্রাথমিক একটি পর্যায়। গভীর চিন্তা-ভাবনা ও আত্মবিশ্লেষণ করার পরেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কোনোভাবেই পরিপন্থী হতে পারে না, যে কারণে তিনি সভানেত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভেবেছিলেন।
নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি জানান যে, দলের সভাপতি হিসেবে নিজে প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব গ্রহণ না করে মনমোহন সিংকে কেন সেই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, তা নিয়ে রাজনীতিতে নানা মহলে বহু আলোচনা ও চর্চা রয়েছে। রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও চাননি যে তাঁদের মা প্রধানমন্ত্রিত্বের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিন।
তিনি যদি নিজে প্রধানমন্ত্রী হতেন তবে ইউপিএ এবং কংগ্রেসের সামগ্রিক রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো খাতে বইত কি না এবং মনমোহন সিংসহ অন্যান্য নেতাদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’ হওয়ায় কী প্রভাব পড়ত, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে এই ধরনের কোনো ধারণাই তাঁর মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র কাজ করেনি এবং তাঁদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল।
তাঁরা সকলে মিলে সর্বদা একটি সুসংহত দল বা টিম হিসেবে যৌথভাবে কাজ করেছেন এবং তাঁদের নিজ নিজ দায়িত্বের পরিধিও সম্পূর্ণ আলাদা ছিল বলে তিনি জানান। মনমোহন সিং যেখানে সরাসরি সরকারের দৈনন্দিন নেতৃত্ব সামলেছেন, ঠিক তেমনি তিনি নিজে সংগঠনের সাংগঠনিক দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে গেছেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর জন্য কোনো ধরনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের ক্ষেত্র অবশিষ্ট নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেমন নির্বাচন কমিশন এবং প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং বিপুল অর্থের পাশাপাশি ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁদের দল এবং সমমনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো একযোগে হাত মিলিয়ে নিরলসভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার এবং ঘুরে দাঁড়ানোর মতো পর্যাপ্ত সাংগঠনিক ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেস দলেরই রয়েছে বলে তিনি দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর