ঢাকা | বঙ্গাব্দ

লালমাটিয়ায় শুরু হলো রেহানা ইয়াসমিনের মৃন্ময় প্রদর্শনী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 25, 2026 ইং
লালমাটিয়ায় শুরু হলো রেহানা ইয়াসমিনের মৃন্ময় প্রদর্শনী ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আমাদের দেশের চেনা জনপদ, উদ্ভিদকূল আর সাধারণ মানুষের অবয়ব নিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী শিল্পসামগ্রী দিয়ে একটি সৃজনশীল ভুবন তৈরি করেছেন কারুশিল্পী রেহানা ইয়াসমিন। রাজধানী শহরের ২/৬ লালমাটিয়ায় অবস্থিত দ্য ইলুশনস গ্যালারিতে দারুণ আকর্ষণের এই মৃন্ময় প্রদর্শনীটি সাজানো হয়েছে। সমসাময়িক চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনের ব্যবস্থাপনায় ‘মাটির মায়া’ শিরোনামে ১২ দিনব্যাপী এই অনন্য শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

এই প্রদর্শনীতে সব মিলিয়ে মোট ৪০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে এবং প্রতিটি উপকরণই মূলত পোড়া মাটির তৈরি, যা সচরাচর টেরাকোটা নামেই বেশি পরিচিত। তবে প্রচলিত এই শিল্পধারার সঙ্গে প্রদর্শিত সৃষ্টিকর্মগুলোর কাঠামোগত ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরনের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। সাধারণত টেরাকোটা কাজের মাধ্যম দ্বিমাত্রিক হয়ে থাকে, যেখানে নরম মাটির স্তরের ওপর খোদাই করে কিংবা ছাঁচে বসিয়ে রিলিফ পদ্ধতিতে নান্দনিক নকশা বা অলংকরণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়। পক্ষান্তরে, আলোচ্য শিল্পী রেহানা ইয়াসমিনের কাজগুলো প্রধানত ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যেখানে ভাস্কর্য নির্মাণের চিরায়ত প্রক্রিয়ায় কাদামাটি দিয়ে অবয়বগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং বিশেষ কারিগরি কৌশলে তা আগুনে পোড়ানো হয়েছে। এই ভিন্নধর্মী পদ্ধতির কারণে শিল্পকর্মগুলো সাধারণ রূপ পেরিয়ে ভাস্কর্যের পূর্ণাঙ্গ গুণাবলি অর্জন করেছে।

গত ২০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বরেণ্য চিত্রশিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, এই প্রদর্শনীটি আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এটি উপভোগ করতে পারবেন।

উদ্বোধনী দিনে শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখার পর বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী নিজের অভিমত ব্যক্ত করে জানান যে, কাদামাটি ব্যবহার করে এ ধরনের জটিল কাজ সম্পন্ন করা অত্যন্ত পরিশ্রমের বিষয়। একই সঙ্গে এর জন্য গভীর মনোযোগ ও প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, যেখানে রেহানা ইয়াসমিনের কাজে সৃজনশীল ক্ষমতার পাশাপাশি চমৎকার দক্ষতা ও করণকৌশলের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। তাঁর নির্বাচিত বিষয়বস্তুর মধ্যে পরিবেশ-প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং হরেক রকমের পাখি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে এবং কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে যা দর্শকদের মনে গভীর দাগ কাটবে।

এখানে আগত দর্শনার্থীরা তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের খুব পরিচিত অনেক দৃশ্যই নিজ চোখে দেখতে পাবেন, যার মধ্যে রয়েছে গাছের শাখা কিংবা ভবনের কার্নিশে স্থির হয়ে বসে থাকা কাক। এ ছাড়া অনেকগুলো পায়রা স্থান পেয়েছে, যেগুলোর কিছু অংশ তাদের নিজস্ব খোপে, গাছের গুঁড়ির কাছাকাছি কিংবা পুরোনো বাড়ির জানালার পাশে বসে আছে। পাখিগুলোর তালিকায় আরও রয়েছে শালিক ও পেঁচার মতো প্রাণী, যাদের শারীরিক ভঙ্গি ও চারপাশের পরিবেশ শিল্পী অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশাপাশি ছাগল সম্পর্কিত কিছু কাজও রয়েছে, যেমন কসাইখানার সামনে বেঁধে রাখা, ছাগল সঙ্গে নিয়ে নারীর ঘরে ফিরে যাওয়ার মুহূর্ত এবং গ্রামীণ উঠানে বসে থাকা ছাগল। এই পশুপাখিগুলোকে কেন্দ্র করে শিল্পী ছোট আকারের বিভিন্ন সিরিজভিত্তিক কাজ সম্পন্ন করেছেন।

আরেকটি ভিন্নধারার কাজের বিষয়বস্তু আবর্তিত হয়েছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে কেন্দ্র করে, যেখানে বাউল শিল্পীদের একতারা ও দোতারা বাজিয়ে সংগীত পরিবেশন করার দৃশ্য দেখা যাবে। পাহাড়ি অঞ্চলের একজন নারীকে ক্লান্ত শরীরে কোনো গাছের নিচে বসে কিছুটা জিরিয়ে নিতে দেখা যায়, আর জুম চাষের ফসল মাথায় করে নিজ গৃহে ফেরার পথ এবং কোলে সন্তান নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে চলার দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর পাশাপাশি দোলনায় দোল খাওয়াররত যুগল, কিছু অলংকৃত মাটির পাত্র এবং প্রাচীন আমলের দরদালানের আংশিক রূপও এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত রয়েছে।

শিল্পকর্মগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে শিল্প সমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন যে, এই বিশেষ প্রদর্শনীটির মাধ্যমে বাংলাদেশের আসল পরিচয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। চারপাশের প্রকৃতি, মানুষের গৃহস্থালির পরিবেশ এবং পরিপার্শ্বের পশুপাখি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আগুনের তীব্র তাপে কাদামাটি শুকিয়ে লালচে বর্ণ ধারণ করা এবং কিছু জায়গায় আগুনের ধোঁয়া লেগে কালচে ছোপ তৈরি হওয়া আমাদের সুদূর প্রাচীন পৃথিবীর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এই শিল্পকর্মগুলো চিরায়ত টেরাকোটার গতানুগতিক বৈশিষ্ট্য অতিক্রম করে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক ভাস্কর্যরীতির গুণ অর্জন করেছে এবং এর সাথে এ দেশের নানা শ্রেণির মানুষের জীবনধারা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে এসব শিল্পকামের নান্দনিক রূপ ও গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করা অত্যন্ত সহজ হবে।

শিল্পী রেহানা ইয়াসমিনের কর্মজীবনে এটিই প্রথম একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগ থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং দেশ-বিদেশের মাটিতে বহু যৌথ প্রদর্শনীতে সাফল্যের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া ‘কালারর্স অব থার্টিন’ নামে নারী শিল্পীদের বিশেষ একটি দলের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে যৌথ শিল্পী কর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছেন।

পরিশেষে বলা যায়, দর্শনার্থীরা রেহানা ইয়াসমিনের ‘মাটির মায়া’ প্রদর্শনীর এই নান্দনিক শিল্পকর্মগুলোতে বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ জীবনের চমৎকার শৈল্পিক রূপ দেখতে পাবেন। শিল্পী আমাদের অত্যন্ত পরিচিত পশুপাখি, সাধারণ মানুষের জনজীবন এবং চেনাজানা পরিবেশকে ত্রিমাত্রিক কাঠামোর ভেতর ফুটিয়ে তুলে পোড়া মাটির শিল্পকর্মে এক অনন্য ও স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইউএনওকে দায়ী করে পোস্ট দেওয়া এসি ল্যান্ড ঢাকায়

ইউএনওকে দায়ী করে পোস্ট দেওয়া এসি ল্যান্ড ঢাকায়