নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে গত দেড় শতাব্দী জুড়ে মানবদেহের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রায় ছাব্বিশ দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের কোঠায় অবস্থান করছে। অথচ দীর্ঘকাল ধরে সুস্থ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের আদর্শ শারীরিক তাপমাত্রা বলতে সাতত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা আটানব্বই দশমিক ছয় ডিগ্রি ফারেনহাইটকেই নিখুঁত মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়ে আসছে। উনিশ শতকের ষাটের দশকে জার্মান চিকিৎসক কার্ল উন্ডারলিচ প্রায় পনেরো বছরব্যাপী বহুসংখ্যক নারীর বগলের তাপমাত্রা সংগ্রহ করে সর্বমোট দশ লাখের বেশি তথ্যের ভিত্তিতে এই মাপকাঠি নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর সেই সুবিশাল সংগৃহীত তথ্যের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই মূলত শ্রমজীবী অসুস্থ রোগীদের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছিল।
বর্তমানে উন্নত জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষ তাদের জীবনের பெரும்ப অংশই কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার এক বিশেষ পরিবেশে অতিবাহিত করে থাকে। তাপীয়-নিরপেক্ষ নামের এই আরামদায়ক পরিবেশে নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে মানবদেহকে অতিরিক্ত কোনো কায়িক পরিশ্রম করতে হয় না। পর্যাপ্ত পরিশ্রমের অনুপস্থিতিতে শরীর পর্যাপ্ত শক্তি উৎপন্ন করতে ব্যর্থ হয় এবং শক্তির অভাবে অভ্যন্তরীণ তাপ উৎপাদনও বহুলাংশে কমে যায়। শরীরের তাপমাত্রা হ্রাসের এই সামগ্রিক প্রবণতা কেবল উন্নত বিশ্বের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা সমগ্র পৃথিবীতেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবিক নৃতত্ত্ববিদ অ্যাড্রিয়ান জায়েগিরের ভাষ্যমতে আমাজন অববাহিকার গভীর অরণ্যে বসবাসকারী সিমানে নামক আধা যাযাবর আদিবাসীদের গড় তাপমাত্রা দুই হাজার সালের শুরুর দিকেও প্রায় সাতত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ছিল। পরবর্তীতে গত দুই দশকেরও কম সময়ে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার দ্রুত ইতিবাচক রূপান্তরের ফলে আঠারো সালের হিসাব অনুযায়ী তাদের শারীরিক গড় তাপমাত্রা কমে ছাব্বিশ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। মানবদেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হ্রাসের পেছনে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মূলত বেশ কিছু সম্ভাব্য ও যৌক্তিক কারণ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে সার্বিকভাবে মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতি এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে। উন্ডারলিচের সেই সময়ে সাধারণ মানুষের গড় বয়স মোটে আটত্রিশ বছর হলেও বর্তমান যুগে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আমলের সাধারণ মানুষ বর্তমানের মতো স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করতে পারত না এবং তারা প্রায়শই যক্ষ্মা, দাঁতের সমস্যা, আমাশয় কিংবা বাতজ্বরের মতো নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত থাকত। প্রাণঘাতী এসব জটিল রোগের আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করার জন্য মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি ব্যয় করতে হতো এবং অতিরিক্ত ক্যালরি মানেই বাড়তি তাপ উৎপাদন।
সিমানে জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও আধুনিক টিকাদান কর্মসূচি এবং উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের ফলেই মূলত তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের এমন লক্ষণীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে। এছাড়া বর্তমান যুগের গৃহস্থালির ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোর প্রায় নিরানব্বই শতাংশ বাসাবাড়িতেই আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিংবা কেন্দ্রীয় উষ্ণায়ন ব্যবস্থার সুব্যবস্থা রয়েছে। এই সমস্ত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ফলে মানবদেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই নিম্নমুখী হয়েছে।
পূর্বোক্ত কারণসমূহ ছাড়াও মানবদেহের গড় তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অনুমানের কথা ব্যক্ত করেছেন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ইতিহাসবিদ ফিলিপ ম্যাককোয়াক। তাঁর সুদৃঢ় ধারণা হলো তাপমাত্রা পরিমাপের সেই পুরোনো মানদণ্ড স্থাপনকারী স্বয়ং জার্মান চিকিৎসক উন্ডারলিচের ব্যবহৃত থার্মোমিটারের নিখুঁত পরিমাপ পদ্ধতিতেই মারাত্মক ত্রুটি ছিল। তিনি উন্ডারলিচের ব্যবহৃত মূল কাচের থার্মোমিটার সরাসরি পরীক্ষা করার এক দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন এবং লক্ষ্য করেছিলেন যে সেগুলোর পরিমাপ মান আধুনিক যন্ত্রের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি বেশি ছিল। অর্থাৎ তৎকালীন সেই যন্ত্রগুলো দিয়ে শরীরের যে কোনো তাপমাত্রার পরিমাপ করা হতো তা আসলে প্রকৃত মানের চেয়ে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি প্রদর্শন করত।
ম্যাককোয়াক আরও জানান যে সেকালে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা মাপা অত্যন্ত জটিল ও কষ্টসাধ্য একটি প্রক্রিয়া ছিল কারণ তখন মুখের ভেতর মাপার পরিবর্তে সরাসরি বগলের নিচে যন্ত্র ধরা হতো। একজন মানুষের বয়স, লিঙ্গ, দিনের নির্দিষ্ট সময় এবং উচ্চতা কিংবা ওজনের ওপর ভিত্তি করে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মূলত ওঠানামা করে থাকে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানবদেহের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীর হয়ে যাওয়ায় বয়স্ক ব্যক্তিদের শারীরিক তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম থাকে। অন্যদিকে পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকে যার পেছনে বিভিন্ন ঋতুচক্রের সুনির্দিষ্ট হরমোনগত প্রভাব কাজ করতে পারে।
দিনের বিভিন্ন সময়ের পরিক্রমায় শরীরের তাপমাত্রার একটি নিজস্ব সার্কাডিয়ান রিদম বা দৈনিক ছন্দ স্পষ্টভাবে বজায় থাকে। সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী রাত তিনটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে এবং বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে তা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। এছাড়া মানুষের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে শরীরের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বেড়ে যায় বলে ভেতর থেকে সহজেই তাপ নির্গত হয়ে তাপমাত্রা কিছু মাত্রায় কমে যেতে পারে। অন্যদিকে মানুষের শারীরিক ওজন বেশি থাকলে তার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে সাতত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে শরীরের একমাত্র আদর্শ তাপমাত্রা হিসেবে গণ্য করার এই প্রচলিত নিয়মটি এখন পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নির্ভরযোগ্য উৎস যথাক্রমে হ্যারিসনস প্রিন্সিপলস অব ইন্টারনাল মেডিসিন এবং আপ-টু-ডেট নামক অনলাইন তথ্যভান্ডারে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা হয়েছে। অধিকাংশ বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরাই একটি নির্দিষ্ট মানের ওপর অতিরিক্ত অন্ধ গুরুত্ব আরোপ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তাদের সুচিন্তিত মতে ছাব্বিশ দশমিক নিরানব্বই ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সাতত্রিশ দশমিক শূন্য এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে কোনো আকাশ-পাতাল বা মৌলিক তফাত নেই। তবে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের তাপমাত্রা পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ছিয়ানব্বই ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নেমে গেলে তা বিপজ্জনক হতে পারে। আবার তাপমাত্রা যদি চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা একশত চার ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠে যায় তবে তা গুরুতর কোনো শারীরিক জটিলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে গণ্য করা হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর