নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার লড়াই তীব্রতর হওয়ায় ওষুধ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন যে, পণ্যের মান বজায় রাখা, নিত্যনতুন গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া এবং উৎপাদন কৌশলে অর্থ ঢালা এখন সময়ের দাবি। ব্যবসায়ীদের ধারণা, অভিনব পণ্য তৈরির পাশাপাশি নতুন অঞ্চলের দুয়ার উন্মোচন করা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও প্রশস্ত হবে।
ওষুধ খাতের বৈশ্বিক আলোচনায় পিআইসি/এস এবং আরওডব্লিউ শব্দ দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পিআইসি/এস মূলত ওষুধ উৎপাদন মান এবং কারখানা তদারকির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের তদারকি সংস্থার যৌথ অংশীদারত্বমূলক একটি ব্যবস্থা, যার অংশীদারদের তালিকায় মার্কিন এফডিএ, অস্ট্রেলীয় টিজিএ এবং সিঙ্গাপুরের এইচএসএর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অপরপক্ষে, আরওডব্লিউ বলতে প্রধান উন্নত দেশগুলোর বাইরের অঞ্চলকে বোঝানো হয়ে থাকে, যার মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র অন্তুর্ভুক্ত।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় অঞ্চলে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো স্থানে ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে বেশ কাজে দেবে, কারণ এসব অঞ্চলের মানদণ্ডের মধ্যে পারস্পরিক মিল রয়েছে। তবে এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়া বেশ দীর্ঘমেয়াদি ও কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলীয় প্রজাতন্ত্রের মতো বিশাল অর্থনীতির দেশেও ওষুধ পাঠানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে পাঠানো ওষুধের সিংহভাগই মূলত আরওডব্লিউভুক্ত অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ করছে। তবে ইদানীং ইউরোপ এবং অস্ট্রেলীয় ভূখণ্ডেও কিছু দেশীয় ওষুধ পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে পণ্যের চালান বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা, সঠিক নিয়মে অনুমোদন নেওয়া এবং স্থানীয় তদারকি সংস্থার প্রতিটি শর্ত কঠোরভাবে মানা আবশ্যক।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এবং হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান এই বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করে জানান, কাঁচামাল আমদানিতে যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে যায়, তার চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি বিশ্বমঞ্চে এই খাত পোশাক খাতকে ছাড়িয়ে যাবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে কারখানা ও পণ্যের নিবন্ধন নিতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর নিরীক্ষার খরচও বহন করতে হয়। এসব জটিলতায় রাষ্ট্র থেকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান আব্দুল মুক্তাদির বলেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার প্রাথমিক ভিত্তি ইতোমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। রপ্তানি খাতের সকল প্রতিবন্ধকতা যদি দূর করা সম্ভব হয়, তবে এই খাতের ব্যাপ্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং এর জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলের জোরালো সহযোগিতা প্রয়োজন।
আব্দুল মুক্তাদির শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নীতিগত বাধাই নয়, বরং উৎপাদকদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন।
বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ওষুধ সরবরাহ জোরালো করতে পণ্যের মান ঠিক রাখার পাশাপাশি বিদেশি তদারকি সংস্থার সকল নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন এ প্রসঙ্গে জানান, দেশের বাইরে ওষুধ পাঠানো তরান্বিত করতে অনুমোদন ও নিবন্ধনের যাবতীয় কার্যাবলি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, টিকা বিক্রির পরিধি বাড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচুরিটি লেভেল-৩ বা এমএল৩ অর্জনের কাজ চলমান রয়েছে। এই মর্যাদা পেতে হলে টিকাসংক্রান্ত অনুমোদন, কারখানা পরিদর্শন, মান পরীক্ষা এবং বাজারে ছাড়ার পরের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণসহ সার্বিক ক্ষেত্রে জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামর্থ্য ফুটিয়ে তুলতে হয়।
আলমগীর হোসেন বলেন যে, এমএল৩ সনদ পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং টিকা সরবরাহের সুযোগ বহুলাংশে প্রসারিত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড পুরোপুরি মেনে উৎপাদনের মান বজায় রাখতে তারা সচেষ্ট আছেন।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রথম ওষুধ বিদেশে পাঠানো শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। দেশের ভেতরের ওষুধের বাজারের বর্তমান আকার প্রায় সাঁইত্রিশ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট চাহিদার সিংহভাগই নিজেদের কারখানায় তৈরি ওষুধ দিয়ে পূরণ করা হলেও প্রায় পঁচাশি শতাংশ কাঁচামালই বিদেশ থেকে আনতে হয়। ১৯৮৮ সালে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস নিজ দেশে প্রথমবারের মতো কাঁচামাল তৈরির কাজ হাতে নেয়। পরবর্তীতে কিছু অগ্রগতি সাধিত হলেও কাঁচামালের আমদানির ওপর নির্ভরতা কাটেনি। এই উপাদান তৈরির জন্য নির্দিষ্ট শিল্প পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হলেও তা এখনো আশানুরূপভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ, ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজস্ব দেশীয় উপায়ে কাঁচামাল তৈরির সামর্থ্য অর্জন করা এই খাতের জন্য একটি বিরাট পরীক্ষা।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর